Articles by "মুক্তকলাম"
Showing posts with label মুক্তকলাম. Show all posts
একটা সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু ছিল ইরান৷ সেখান থেকে চিরশত্রুতায় রূপ নিয়েছে তাদের সম্পর্ক৷ কিন্তু কীভাবে এই মেরুকরণ ঘটল? 

১৯৫১ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন মোহাম্মদ মোসাদ্দেক৷ তিনি ব্রিটিশদের কাছ থেকে দেশটির তেল সম্পদ জাতীয়করণ করেন৷ ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই সিক্স এবং এবং মার্কিন সিআইএ ক্যু ঘটিয়ে মোসাদ্দেককে উৎখাত করে৷ মোসাদ্দেকের পতনের পর ক্ষমতায় ফেরেন ইরানের নির্বাসিত শেষ সম্রাট শাহ রেজা পাহলভি৷ পরবর্তী দুই দশক ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিবিড় বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে মার্কিন অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতায় পরিণত হয় পারস্য উপসাগরের দেশটি৷ যুক্তরাষ্ট্রের কোন অনুরোধই এসময় ফেলেননি শাহ, এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার৷

সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের (বায়ে) সাথে ইরানের শাহ রেজা পাহলভি (ডানে)
শাহের আমলে ইরানের তেল ব্যবসায় প্রায় একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ছিল ব্রিটিশ ও আমেরিকান কোম্পানিগুলোর৷ কিন্তু ইরানি জনগণের মধ্যে রাজতন্ত্রবিরোধী ক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করে৷ ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন রেজা শাহ পাহলভি৷ দুই সপ্তাহ পর দেশে ফেরেন নির্বাসিত নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লা খোমেনি৷ তিনি ইরানের ‘ইসলামি বিপ্লবের’ নেতৃত্ব দেন৷ কিছুদিনের মধ্যেই দেশটির ছাত্ররা তেহরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে৷ ৪৪৪ দিনের জন্য বন্দী হয় ৫২ আমেরিকান৷ বন্দী সঙ্কটের সমাধান না হওয়ায় ইরানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের ঘোষণা দেন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার৷ দেশটিতে মার্কিন পণ্য রপ্তানি ও তেল আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়৷ জব্দ করা হয় ইরানের ১২ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ৷ বের করে দেয়া কূটনীতিকদের৷ 

এর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ইরান আক্রমণ করে সাদ্দাম হোসেন৷ যুদ্ধ চলাকালে ইরাককে গোয়েন্দা প্রতিবেদন, অর্থ, সামরিক প্রযুক্তি এমনকি রাসায়নিক অস্ত্রও সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র৷ এই যুদ্ধ চলে আট বছর৷ এসময় লেবাননে ইরানের সমর্থিত হিজবুল্লাহ গোষ্ঠীর হামলায় বৈরুতের একটি ব্যারাকে ২৪৪ মার্কিন সৈন্য নিহত হয়৷ 

১৯৮৮ সালে পারস্য উপসাগরে ইরানের একটি যাত্রিবাহী বিমানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র৷ নিহত হয় ইরানের ২৯০ জন যাত্রী৷ একে দুর্ঘটনা হিসেবে অভিহিত করেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগান৷ এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক আরও তিক্ততায় রূপ নেয়৷ 

ইরান সন্ত্রাসীদের মদত দেয়ার পাশাপাশি পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে, এমন অভিযোগে দেশটিকে একঘরে করার জন্য প্রচার চালায় ক্লিনটন প্রশাসন৷ ১৯৯৬ সালে বিদেশি কোম্পানিগুলোর ইরানে বিনিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ওয়াশিংটন৷ ১৯৯৮ থেকে পরবর্তী দুই বছর মোহাম্মদ খাতামি সরকারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আগ্রহ প্রকাশ করে ক্লিনটন প্রশাসন৷ এজন্য রোডম্যাপও ঘোষণা করা হয়৷ খাতামি দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের প্রস্তাব দেন৷ ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পণ্য আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়৷ 

২০০৫ সালে আহমদিনেজাদের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের আবারও অবনতি ঘটে৷ ইরান এসময় পরমাণু কার্যক্রম শুরু করে৷ বুশ ইরানকে সন্ত্রাসের রপ্তানিকারক হিসেবে অ্যাখ্যায়িত করে৷ তবে ২০১৫ সালে ওবামা যুক্তরাষ্ট্র ও জোট রাষ্ট্রগুলোর সাথে ইরানের পরমাণু কার্যক্রম স্থগিতকরণ চুক্তি করায় বৈরিতার সেই বরফ কিছুটা গলে৷ 

২০১৮ সালে ইরানের সঙ্গে পরমানু চুক্তি বাতিল করে ডোনাল্ড ট্রাম্প৷ ইরানের উপর চাপ প্রয়োগ করতে নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে ওয়াশিংটন৷ দুই দেশের প্রক্সি ওয়ার অনেকটাই যুদ্ধাবস্থায় রূপ নিয়েছে চলতি বছরের তিন জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার পর৷ 

সূত্র: ডয়চে ভেলে। 

সৌদি আরব বলছে, শনিবার সৌদি তেল শোধনাগারের ওপর ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পেছনে যে ইরান রয়েছে সেই প্রমাণ তাদের হাতে রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

প্রশ্ন হচ্ছে: এ নিয়ে কী ঐ দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যেতে পারে?

যে মাত্রায় হামলার ঘটনাটি ঘটেছে সৌদি আরব তা কোনমতেই এড়িয়ে যেতে পারবে না। এবং ইরানই যে ঐ হামলার জন্য দায়ী সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর সৌদি আরবকে একটা পাল্টা জবাব দিতেই হবে।

ঐ হামলার ঘটনাটি জাতিসংঘ এখন তদন্ত করে দেখছে। সেই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সৌদি সরকার সম্ভবত অপেক্ষা করবে।

এর ফলে যে কোন পদক্ষেপ নেয়ার আগে সৌদি সরকার কিছুটা সময় হাতে পাবে। যদিও বিশেষজ্ঞরা সবাই একমত যে ইরানের বস্তুগত সাহায্য এবং নির্দেশনা ছাড়া ঐ হামলার ঘটনা ঘটানো অসম্ভব।

বাজির খেলায় ইরান

ইরানের তরফ থেকে ঐ হামলার দায়দায়িত্ব শুধু অস্বীকার করলেই যথেষ্ট হবে না।

সৌদি আরব এবং তার মিত্র দেশগুলো বিশ্বাস করে যে ইরান এই বিষয়ে তাদের বাজির মাত্রা বাড়াতে চায় এই লক্ষ্যে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যেন ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন।

গত বছর ইরানের সাথে একটি পরমাণু চুক্তি মি. ট্রাম্প একতরফা-ভাবে প্রত্যাহার করেন এবং নতুন করে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন।

ইরানের নেতারা আশা করছেন, পারস্য উপসাগরে যুদ্ধের সম্ভাবনা বাড়লে বিশ্ব নেতারা টের পাবেন ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কতোটা বিপজ্জনক হতে পারে।

ইরানের নেতারা আশা করছিলেন, পরমাণু চুক্তি পালন করার মধ্য দিয়ে এবং ঐ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্ণ না করার শর্তে, ইরান ফ্রান্সের কাছ থেকে ১৫০০ কোটি ডলার ঋণ সুবিধে পাবে।

কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই পরিকল্পনায় সায় দেননি। শুধু তাই না, গত বুধবার মি. ট্রাম্প মার্কিন অর্থমন্ত্রীকে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়া নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে, ইরান এই বাজিতে দৃশ্যত হেরে গেছে বলেই মনে হচ্ছে।

সৌদি আরবের ওপর যে মাত্রায় আঘাত হানা হয়েছে, তা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেনির অনুমোদন ছাড়া ঘটা অসম্ভব ছিল।

গত সপ্তাহে মি. খামেনি যে ভাষণ দিয়েছেন তাতে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগারে হামলার কোন কথা কিংবা ঐ অঞ্চলে যে কোন মুহূর্তে লড়াই বেধে যাওয়ার সম্ভাবনার কথার লেশমাত্র ছিল না।

এর বদলে, ঐ ভাষণে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যে কোন পর্যায়ে আলোচনাকে তিনি খারিজ করে দেন।

তবে আজ হোক কাল হোক, আয়াতোল্লাহ খামেনিকে হয়তো তার অবস্থান পরিবর্তন করতে হতে পারে এবং আলোচনার টেবিলে ফিরে যেতে হতে পারে, ইরানের নরমপন্থী নেতারা যেটা আশা করছেন।

ইরানের ভঙ্গুর অর্থনীতি

ইরানের তেল রপ্তানি এখন শূন্যের কোঠায়। এর অর্থের মজুদ দ্রুত ফরিয়ে আসছে। এখন যা বৈদেশিক মুদ্রা রয়েছে তা দিয়ে মাত্র কয়েক মাস চলবে।
ইরানি মুদ্রার মান কমে আসার ফলে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে ৪০%। এর ফলে ইরানিদের ক্রয়ক্ষমতা প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে।
তাই, অনেক ইরানির জীবনযাত্রাই এখন কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

সৌদি সামরিক পদক্ষেপের বিপদ

তাহলে ইরানকে হটিয়ে দিতে সৌদি আরব কী সামরিক ব্যবস্থা নিতে পারে?

তেমন সম্ভাবনা কম বলেই মনে হচ্ছে। ইরানের জনসংখ্যা এখন ৮ কোটি। অন্যদিকে সৌদি আরবের জনসংখ্যা ৩.৩ কোটি।

ইরান তার অস্ত্রভাণ্ডারে হাজার হাজার মিসাইল মজুদ রেখেছে। সৌদি তেল-ক্ষেত্র, শোধনাগার, সামরিক ঘাঁটি এবং জনবহুল শহরগুলো এর লক্ষবস্তুতে পরিণত হতে পারে।

তুলনামুলকভাবে সৌদি আরবের অস্ত্রভাণ্ডারে শত শত চীনা মিসাইল থাকলেও তাদের মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বেশ দুর্বল।

সৌদি বিমান বাহিনীতে জঙ্গি বিমানের সংখ্যা ইরানের প্রায় সমান। তবে সৌদি বিমানগুলো বেশ আধুনিক এবং কার্যকর। অন্যদিকে ইরানের বিমান বাহিনীর জঙ্গি বিমানগুলো বেশ পুরনো এবং অদক্ষ।

পুরো মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে ইরানের মিত্ররা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। সৌদি আরবের শিয়া জনগোষ্ঠীর সমর্থনও ইরান পাবে।

ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরব ইতোমধ্যেই এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। এই যুদ্ধের জন্য তার প্রচুর অর্থব্যয় হচ্ছে।

তবে যদি সৌদি আরব এবং ইরানের মধ্যে কোন সরাসরি লড়াই শুরু হয়, তাহলে দু'পক্ষকেই নির্ভর করতে হবে বিমান বাহিনী এবং ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির ওপর। কিন্তু ঐ যুদ্ধে কোন পক্ষেরই নিরঙ্কুশ বিজয় হবে না।

উপসাগর উত্তপ্ত

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা, বিমান এবং নৌবহর মোতায়েন থাকলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কোন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে নারাজ।

কারণ, লড়াই শুরু হলে মার্কিন সেনা-ঘাঁটি এবং নৌবহরগুলো ইরানি হামলার ঝুঁকিতে পড়ে যাবে।

এছাড়া, বিশ্বের সর্বমোট তেল চাহিদার এক পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেটিও তখন যুদ্ধের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে। যুদ্ধের পটভূমিতে মার্কিন নির্বাচন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসছে। এ পরিস্থিতিতে মার্কিন পেট্রোল পাম্পগুলোতে তেলে দাম হঠাৎ করে আকাশ-ছোঁয়া হয়ে গেলে মি. ট্রাম্পের আবার নির্বাচনে জেতার আশা কঠিন হয়ে পড়বে।

সৌদি আরবের জন্য মার্কিন সমর্থন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মি. ট্রাম্প চাইছেন, এই যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে হবে সৌদি আরবকে এবং তাকে সাহায্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যে ব্যয় হবে সৌদি সরকার সেটি পুষিয়ে দিলেই তিনি খুশি।

ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার প্রশ্নে সৌদি আরব তার দুই প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাহরাইনকেও পাশে চায়।

ইরানের সাথে সৌদি যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তার ইয়োরোপীয় মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক সমর্থন চাইতে পারে। কিন্তু সমস্যা হলো ইয়োরোপীয় দেশগুলো মনে করে এখন ইরানকে ঘিরে যে পরিস্থিতি তার সূত্রপাত ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে মি. ট্রাম্পের সরে আসার একক সিদ্ধান্ত।

ইরানের ভেতরে যার কট্টরপন্থী রয়েছেন তাদের এখনকার ভাবনা, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের প্রশ্নে পদক্ষেপ না নিয়ে দেশকে আরেকটা যুদ্ধের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল আসলে কতোটা সুবিবেচকের কাজ হবে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা কার্যকরী ছিল পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। একবিংশ শতাব্দীতে এসে সে চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীর অনেকে দেশে গণতন্ত্র নামেমাত্র কার্যকর রয়েছে।

কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে নির্মিত বিদ্রুপাত্মক চলচ্চিত্র 'দ্যা গ্রেট ডিক্টেটর'-এ অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিন। চলচ্চিত্রটি ১৯৪০ সালে মুক্তি পায়।


বিংশ শতাব্দীর মতো অনেক দেশে সরাসরি সামরিক শাসন না থাকলেও, অনেক দেশে গণতান্ত্রিক-ভাবে নির্বাচিত সরকারগুলো সামরিক একনায়কদের মতোই আচরণ করছে বলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে।


অনেক দেশে পরিপূর্ণ বেসামরিক সরকার থাকলেও সেখানে গণতন্ত্র কতটা কার্যকরী আছে সেটি নিয়ে অনেক প্রশ্নের উদয় হয়েছে।

একটি দেশে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সে দেশে গণতন্ত্র নাও থাকতে পারে। কিভাবে বুঝবেন একটি দেশে গণতন্ত্র নেই?

১. প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন:

গণতন্ত্রের মূল বিষয় হচ্ছে নির্বাচন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মধ্যে নির্বাচন হলো 'গণতন্ত্রের প্রাণভোমরা' । সে নির্বাচন হতে হবে এবং অবাধ ও স্বচ্ছ। যে দেশে নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি এবং জবরদখল হয় সেটিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা বলতে নারাজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। 


২. একনায়করাও নির্বাচন করে:

যেসব দেশে বেসামরিক একনায়কতন্ত্র আছে সেখানেও নিয়মিত নির্বাচন হয়।
কারণ তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে শাসকগোষ্ঠী তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার চেষ্টা অব্যাহত রাখে।
এখন নির্বাচনে কারচুপি শুধু জাল ভোটের মাধ্যমে ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়না, এর নানা দিক আছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের গবেষক ব্রায়ান ক্লাস বলেন, নির্বাচনের সময় অধিকাংশ একনায়ক শাসক তাদের প্রতিন্দ্বন্দ্বিকে নানা কৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনে অযোগ্য করে দেন।

৩. জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করা:

গণতন্ত্রে জনগণের মতামতের প্রাধান্য একটি বড় বিষয়। একটি সরকার নির্বাচিত হলেই গণতান্ত্রিক হয়না।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতন্ত্র না থাকলে এবং একনায়কতন্ত্রের আবির্ভাব হলে জনগণের মতামতকে সহিংসভাবে দমনের চেষ্টা করা হয়।
এর ফলে জনগণ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ইয়াহিয়া আখতার বলেন, 'সিভিলিয়ান অটোক্র্যাট' বা 'বেসামরিক স্বৈরশাসক' বলে একটি কথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে চালু আছে। তিনি বলেন, "অনেক সময় গণতান্ত্রিক সরকারের চরিত্র দেখে অনেক সামরিক শাসকও লজ্জা পেতে পারে।"


২০১২ সালে নির্মিত কমেডি চলচ্চিত্র 'দ্য ডিক্টেটর''। এই চলচ্চিত্রে কাল্পনিক দেশ ওয়াদিয়ার স্বৈরশাসকের চরিত্রে অভিনয় করেন সাচা ব্যারন কোহেন। একটি দেশে একজন স্বৈরশাসকের পক্ষে কী কী নৈরাজ্য চালানো সম্ভব তা ঠাট্টা এবং তামাশাচ্ছলে চলচ্চিত্রটিতে তুলে আনেন পরিচালক।


৪.
ভোটার অংশগ্রহণ কমে যাবে:


দেশে গণতন্ত্র থাকেনা সেখানে শাসকগোষ্ঠী নিয়মিত নানা ধরণের নির্বাচন অনুষ্ঠান করলেও সেসব নির্বাচনের প্রতি মানুষের কোন আস্থা থাকেনা। ভোটাররা ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। তারা ভোট দেবার জন্য ভোট কেন্দ্রে যেতে চায়না।

৫. সংসদ হবে একদলীয়:

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে একটি দেশে যখন গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুত হবার দিকে ধাবিত হয় তখন সংসদে ক্ষমতাসীনদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে। সংসদে কার্যত কোন বিরোধী দল থাকেনা।

৬. নিরাপত্তা বাহিনীর প্রভাব:

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে গণতন্ত্র না থাকলে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলো নানা ধরণের আইন-বহির্ভূত কাজ জড়িয়ে পরে। কারণ, শাসক গষ্ঠী তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নিরাপত্তাবাহিনীকে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সাধারণ মানুষকে দাবিয়ে রাখার কাজে ব্যবহার করে।

৭. দুর্বল প্রতিষ্ঠান:

অধ্যাপক ইয়াহিয়া আখতারের মতে গণতন্ত্র কায়েম করতে হলে কিছু প্রতিষ্ঠানকে কার্যকরী করতে হয়। যেমন: নির্বাচন কমিশন, সংসদ, বিচার বিভাগ ইত্যাদি। অধ্যাপক আখতার বলেন একটি দেশে যদি এসব প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব থাকে এবং সেগুলো ভঙ্গুর অবস্থার দিকে অগ্রসর হয়, তাহলে বুঝতে হবে সে দেশে গণতন্ত্র নেই।

৮. মতপ্রকাশে ভয় পাওয়া

গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি হয়। সেক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমও স্বাধীনভাবে কাজ করতে ভয় পায়। এমনকি শাসকগোষ্ঠী ইন্টারনেটও নিয়ন্ত্রণ করতে চায় যাতে করে মানুষ সেখানে নিজেদের মতামত প্রকাশ করতে না পারে।

৯. দুর্নীতি বেড়ে যাওয়া:

একনায়কতন্ত্রে দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ক্রয় করার জন্য এই দুর্নীতি ব্যবহার করা হয়। এই ব্যবস্থায় দুর্নীতি এমন সুন্দরভাবে সাজানো হয় যে, সেটি অল্প কিছু ব্যক্তির উপর নির্ভর করে। শাসকের অনুগত হবার বিনিময়ে তাদের দুর্নীতি করার সুযোগ করে দেয়া হয়। ফলে তারা আরো ধনী হয়। যদি কোন কারণে সন্দেহ হয় যে তারা শাসকের অনুগত নয়,তখন তাদের দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।

১০. ক্ষমতা হারানোর ভয়

একনায়ক শাসকরা অবসরের ভয়ে থাকেন। তাদের মনে থাকে যে ক্ষমতা হারানোর পর একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতির তৈরি হবে। ফলে তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ প্রতিশোধ নিতে পারে।

২০১৫ সালের গোড়ার দিকে (সঠিক তারিখটি এখন মনে নেই) একাত্তর টেলিভিশনের একটি টকশোয় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলাম। আমার সে বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে ‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ ওই বছরের ২০ মে ‘গুলশান অফিস নিয়ে অস্থিরতা’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। লিড নিউজ হিসেবে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে সে সময়ে বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান অফিসকে ঘিরে গড়ে ওঠা একটি সুবিধাভোগী চক্রের তৎপরতার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছিল। ওই টকশোয় আমি বিএনপি চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত দুই কর্মকর্তা (বিশেষ সহকারী ও প্রেস সচিব) কীভাবে দলকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছেন, বেগম জিয়াকে নেতা-কর্মী ও মিডিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছেন, ব্যক্তিস্বার্থে গ্রুপিং সৃষ্টি করে দলের মধ্যে অনৈক্য সৃষ্টি করছেন তা সবিস্তারেই বলেছিলাম। একই সঙ্গে আমি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলাম, এই দুই কর্মকর্তার কারণে বিএনপি চেয়ারপারসন ও তাঁর দলকে সীমাহীন খেসারত দিতে হবে। বাংলাদেশ প্রতিদিনের রিপোর্টে দলটির নেতাদের অভিমতসহ তা আরও বিশদভাবে তুলে ধরা হয়েছিল। ওই বছর ২৪ জানুয়ারি মারা যান জিয়া-খালেদাপুত্র আরাফাত রহমান কোকো। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শোকার্ত মা খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে ছুটে গিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে। কিন্তু তাঁকে সেখানে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ন্যক্কারজনক ওই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিলাম সম্ভবত ২৬ জানুয়ারি রাতে প্রচারিত একই টিভির টকশোয়। সেদিনের ঘটনা যারা টিভি পর্দায় প্রত্যক্ষ করেছেন, তাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, প্রধানমন্ত্রী ফেরত চলে আসার পর শিমুল বিশ্বাস একটি সাদা খাতা দেখিয়ে সাংবাদিকদের বলছিলেন, ‘আমরা তো প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষরের জন্য শোকবই রেডি করেছিলাম।’ আমি ওই টকশোয় তার এ কথাকে ‘অডাসিটি’ (ঔদ্ধত্য) আখ্যা দিয়ে বলেছিলাম, প্রধানমন্ত্রী কি রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্বাক্ষর করবেন? ঘটনাটি উল্লেখ করলাম এজন্য, বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় নিয়ে এ ধরনের বহু অভিযোগ এযাবৎ প্রকাশিত হয়েছে।

দলকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে এ ধরনের অনেক ঘটনাই সেখানে ঘটানো হয়েছে। পাশাপাশি দলের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে বিশেষ স্বার্থ হাসিলে তৎপর ছিল একটি চক্র। আর সে চক্রের নেতৃত্বে ছিলেন ওই দুজন; কখনো যৌথভাবে, কখনো এককভাবে। একই বছরের ১৭ জুন ‘গুলশান কার্যালয়ে ঠান্ডা লড়াই’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ট্যাবলয়েড দৈনিক মানবজমিন। ওই প্রতিবেদনে চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস ও প্রেস সচিব মারুফ কামাল খান সোহেলের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে টাগ অব ওয়ারের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছিল। সেখানে এও উল্লেখ করা হয়েছিল যে, ‘তৃণ-মূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ও পরে গুলশান কার্যালয়ের গুটিকয় কর্মকর্তার ‘বিতর্কিত’ সিদ্ধান্তে চরম বেকায়দায় পড়ে বিএনপি। ২০১৫ সালের শুরুতে তিন মাসের আন্দোলনে ওইসব প্রভাবশালী কর্মকর্তাই ছিলেন হর্তাকর্তা।’ 

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন, ২০১৫ সালের হঠকারী আন্দোলন বিএনপিকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সন্দেহ নেই। সেসব ভুল সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মচারীদের প্রভাব ও ভূমিকা এখন সর্বজনবিদিত। অনেকেরই স্মরণে থাকার কথা, ২০১৫ সালের ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে ভোট গ্রহণের দিন দুপুরে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় বিএনপি। সেদিন একটি টেলিফোন সংলাপ ফাঁস হয়। টেলিফোনের কথকদ্বয় ছিলেন বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস। টেলিফোনে শিমুল বিশ্বাস মওদুদ আহমদের কাছে জানতে চান নির্বাচন বর্জন ঘোষণার সংবাদ সম্মেলন কোথায় করবেন? জবাবে মওদুদ আহমদ পাল্টা প্রশ্ন করেন ‘তুমি কোথায় করতে বল?’ অর্থাৎ শিমুল যেখানে বলবেন তিনি সেখানেই সংবাদ সম্মেলন করবেন। ওই রাতেই একটি টিভি টকশোয় মওদুদ আহমদের এ হীনমন্যতায় বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছিলাম, দলের স্থায়ী কমিটির একজন সিনিয়র সদস্য যখন চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত কর্মচারীর নির্দেশনার অপেক্ষায় থাকেন, সে দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি শঙ্কিত। 

একটি রাজনৈতিক দলের সাংগঠনিক কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু এর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী গুলশান কার্যালয় স্থাপিত হওয়ার পর থেকেই দলের মধ্যে একটি বিভাজন তৈরি হতে শুরু করে। সে সময় কোণঠাসা হয়ে পড়েন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ও তার সহযোগীরা। সেই শুরু ‘বিএনপি বনাম বিএনপি’ অঘোষিত যুদ্ধ। ওই কার্যালয়ের অতিশয় ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের দুর্ব্যবহারের কারণে অনেক শীর্ষস্থানীয় নেতা সেখানে যাওয়া ছেড়েই দিয়েছিলেন। বেগম জিয়া না ডাকলে তারা সেখানে পদার্পণ করতেন না। আত্মসম্মান বাঁচানোর জন্যই সেখানে যাওয়া থেকে তারা বিরত ছিলেন। কয়েকবারের এমপি-মন্ত্রী, দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের সদস্যদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওয়েটিংরুমে বসিয়ে রাখা হতো ‘ম্যাডাম ব্যস্ত আছেন’ বলে। অনেক সময় তারা নেত্রীর সঙ্গে দেখা না করেই চলে আসতে বাধ্য হতেন। শেষ দিকে মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনও চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে খুব একটা যেতেন না। আর সে সুযোগে ওই চক্র তার বিরুদ্ধে চেয়ারপারসনের কান ভারী করে তোলে। স্থায়ী কমিটির মিটিংয়েও অনেকে যেতে উৎসাহবোধ করতেন না। এ সম্পর্কে স্থায়ী কমিটির একাধিক সদস্য আমাকে বলেছেন, ‘কী যাব? আমরা যে সিদ্ধান্ত নিই, পরে দেখি প্রচার হয়েছে উল্টোটা।’ কারা এ পরিবর্তন ঘটায়? এ প্রশ্নের জবাবে তারা অভিন্ন জবাব দিয়েছিলেন- ‘যারা ম্যাডামকে ঘিরে আছেন, ক্ষমতাবান, তারাই করেন।’

গুলশান অফিস নিয়ে বিএনপির তৃণমূল নেতা-কর্মীদের অভিযোগের অন্ত নেই। তাদের সেসব অভিযোগ পত্রিকার খবরে উঠে এসেছে বহুবার। কমিটি বা পদ-পদবি বিক্রি, দলের ভিতরে কোন্দল সৃষ্টি, অনুগত লোকজনকে বিভিন্ন পদে পোস্টিং ইত্যাদির মাধ্যমে দলে বিভক্তি সৃষ্টির অভিযোগ পুরনো। এসব কথা কেউ যে নেত্রীর কানে তোলেনি তা নয়। কিন্তু নেত্রী তা ধর্তব্যের মধ্যে নেননি। ফলে ‘যাহা বাহান্ন তাহা তিপ্পান্ন’ই রয়ে গেছে। দিন গড়িয়েছে, দল দুর্বল থেকে দুর্বলতর হয়েছে। সম্প্রতি আবার গুলশান অফিসকে নিয়ে কথা উঠেছে। বিএনপির দুই অফিসের মধ্যে টানাপোড়েনের কাহিনি পুরনো। এখন আবার দলটির দুই বলয় সক্রিয় দুই অফিসকে কেন্দ্র করে। গত ২৮ জুলাই একটি দৈনিক ‘গুলশান-নয়াপল্টনে বিভক্ত বিএনপি’ শীর্ষক বিশেষ প্রতিবেদনে সে কথাই তুলে ধরেছে। তাতে বলা হয়েছে, বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয় আর নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন দলটির শীর্ষস্থানীয় নেতারা। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গুলশান কার্যালয় থেকে এবং সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী নয়াপল্টনে বসে দলীয় সিদ্ধান্ত দেন। দুজনই আলাদাভাবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশনা নেন। এ নিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্য অসন্তোষ বিরাজ করছে বলেও উল্লেখ করেছে পত্রিকাটি। নেতাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পত্রিকাটি লিখেছে, গুলশান ও নয়াপল্টনের মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে পড়েছে। জাতীয় ইস্যুতে সিদ্ধান্ত আসে গুলশান থেকে। দলের অভ্যন্তরীণ ও সাংগঠনিক বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয় নয়াপল্টনে। এসব সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি, ভাইস চেয়ারম্যান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে ৫৮৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় কমিটির অধিকাংশ নেতার সম্পৃক্তি থাকে না। এসব কারণে দলটির অধিকাংশ নেতা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন এবং তাদের সক্রিয় করার কোনো উদ্যোগও নেই বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে। 

গণমাধ্যমে যেসব খবর বিএনপি সম্পর্কে প্রকাশিত হচ্ছে তা একটি রাজনৈতিক দলের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। একসময়ের প্রতাপশালী রাজনৈতিক দল বিএনপির এ হতচ্ছাড়া দশা অনেককেই পীড়া দেয়। বিশেষ করে গণতন্ত্রমনস্ক ব্যক্তি, যারা চান দেশে একটি প্রতিযোগিতামূলক গণতান্ত্রিক রাজনীতি চালু থাকুক, তাদের জন্য এটা মনঃকষ্টেরই কারণ। একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সুদিন-দুর্দিন অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার। সুদিনকে সঠিক পন্থায় কাজে লাগানো এবং দুর্দিনে বিচক্ষণতার সঙ্গে দল পরিচালনাই শীর্ষ নেতৃত্বের দায়িত্ব। বিএনপির এখন চরম দুর্দিন যাচ্ছে এটা অস্বীকার করা যাবে না। এক যুগ পার হয়ে গেছে দলটি রাষ্ট্রক্ষমতার বাইরে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণত সাংগঠনিক শক্তি দৃঢ় করার কাজে মনোনিবেশ করতে দেখা যায়। কিন্তু বিএনপিতে এর একেবারে উল্টো চিত্র দৃশ্যমান। যেখানে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে সরকারের মোকাবিলা করতে সবার সচেষ্ট হওয়ার কথা, সেখানে নিজেদের মধ্যে শক্তি ক্ষয় করে দলকে আরও হীনবল করতেই নেতারা ব্যাপৃত। সাংগঠনিক বিষয়ে এমন সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যা দলটিকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে। যে সময়ে দলটিকে অধিকতর ঐক্যবদ্ধ করার প্রয়াস কাম্য, নেতাদের কর্মকান্ডে সেখানে বিভক্তি আরও বেড়ে যাচ্ছে। নিজেদের স্বার্থগত দ্বন্দ্বে তারা কর্মীদের সম্পৃক্ত করে দলটিকে ঠেলে দিচ্ছেন পেছনের দিকে। দলটি এতটাই নির্জীব হয়ে পড়েছে যে, চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে রাজপথে পা রাখার সামর্থ্যও হারিয়েছে। যদিও শীর্ষস্থানীয় নেতারা অহরহ বলে চলেছেন, দুর্বার আন্দোলন ছাড়া নেত্রীকে মুক্ত করা যাবে না এবং সে ধরনের আন্দোলনের মাধ্যমেই তারা নেত্রীকে মুক্ত করে আনবেন। কিন্তু সে দুর্বার গণআন্দোলন কবে কীভাবে তারা সংগঠিত করবেন, জনগণকে তাতে সম্পৃক্ত করবেন, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা নেই। 

শীর্ষনেতাদের এসব বায়বীয় আস্ফালন তৃণ -মূল নেতা-কর্মীদের মনে কেবল হতাশাই বাড়িয়ে দিচ্ছে। অবশ্য এরই মধ্যে নেত্রীর মুক্তি দাবিতে বরিশাল, খুলনা ও চট্টগ্রামে তিনটি বৃহদাকারের সমাবেশ দলটি করেছে। তবে সেসব সমাবেশ থেকেও নেত্রীর মুক্তি আন্দোলনের সুনির্দিষ্ট কোনো দিকনির্দেশনা আসেনি। অনেকে এসব সমাবেশকে নেতাদের মুখরক্ষার সমাবেশ বলেও কটাক্ষ করছেন। এদিকে গত ২৯ জুলাই একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য বিএনপি নেতারা এখন সরকারের ভরসায় রয়েছে। একই দিনের অন্য একটি দৈনিকের খবরে বলা হয়েছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থায় উদ্বিগ্ন তার পরিবারের সদস্যরা দলের নেতাদের আন্দোলন বা আইনজীবীদের আইনি লড়াইয়ের প্রতি আর আস্থা রাখতে পারছেন না। তাই শেষ পর্যন্ত প্যারোলের দিকেই তারা ঝুঁকছেন। এ বিষয়ে খালেদা জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন। খবরে বলা হয়েছে, মুক্তির শর্ত হিসেবে খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়ার শর্ত দিয়েছে সরকার। শামীম ইস্কান্দার ওই শর্তে রাজিও হয়েছেন বলে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছে। খবরে বলা হয়েছে, বিএনপি যদি প্যারোল চায়, তাহলে সরকার তা বিবেচনা করবে। যদি তাই হয়, তাহলে খালেদা-ভক্তদের জন্য তা স্বস্তির বিষয় হলেও দল হিসেবে বিএনপিকে দাঁড় করাবে উত্তরহীন প্রশ্নের মুখে। প্রমাণিত হবে, দলটি তাদের শীর্ষনেত্রীর মুক্তির জন্য তিল পরিমাণ ভূমিকাও রাখতে পারেনি। এ ব্যর্থতার দায় তো তাদেরই নিতে হবে, যারা এ মুহূর্তে দলটির স্টিয়ারিংয়ে রয়েছেন। 

মহিউদ্দিন খান মোহন
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

১৯৬৯ সালের জুলাই মাসে প্রথম চাঁদে গিয়ে যখন নেমেছিলেন মার্কিন নভোচারীরা, সেই ঘটনা বিশ্বজুড়ে দেখেছেন কোটি কোটি মানুষ। 

কিন্তু পৃথিবীতে এখনো এমন বহু মানুষ আছেন, যারা বিশ্বাস করেন, মানুষ আসলে কোনদিন চাঁদে যায়নি।
চাঁদের দিকে নামছে অ্যাপোলো-১১ এর লুনার মডিউল। কিছু মানুষ বিশ্বাস করে এটি ছিল সাজানো ঘটনা।
মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা এ বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে জরিপ চালিয়েছে। তাদের জরিপে সব সময় দেখা গেছে, চাঁদে মানুষ যাওয়ার ব্যাপারটিকে সাজানো ঘটনা বলে মনে করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় পাঁচ শতাংশ মানুষ। 

এদের সংখ্যা হয়তো কম, কিন্তু চাঁদে যাওয়ার ব্যাপারে অবিশ্বাস ছড়ানোর জন্য যড়যন্ত্র তত্ত্ব জিইয়ে রাখতে সেটিই যথেষ্ট। 

'চাঁদে যাওয়ার ধাপ্পা' 
বিল কেসিং: চাঁদের অভিযান যে সাজানো ঘটনা, এই ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রথম প্রচার করেন তিনি। চাঁদে মানুষ যাওয়ার ব্যপারটিকে পুরোপুরি ধাপ্পাবাজি মনে করেন যারা, তারা এর সপক্ষে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেন। এরা মনে করেন মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা'র সেরকম প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ তখনো ছিল না, যেটি সফল অভিযানের জন্য দরকার ছিল। 

এই যুক্তি দিয়ে এরা বলে থাকেন, নাসা তাদের অভিযান যে সফল হবে না, সেটা বুঝে ফেলেছিল। কাজেই তারা সোভিয়েত ইউনিয়নকে মহাকাশ অভিযানে টেক্কা দেয়ার জন্য হয়তো চাঁদে সফল অভিযান চালানোর নাটক সাজিয়েছে। কারণ মহাকাশ অভিযানে সোভিয়েত ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে এগিয়ে ছিল, এমনকি তারা চাঁদের বুকে একটি যান ক্র্যাশ ল্যান্ড করিয়েছিল। 

নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের বুকে পা দিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ডালপালা ছড়াতে থাকে। 

তবে এসব গুজব বা ষড়যন্ত্র তত্ত্ব পাত্তা পেতে শুরু করে ১৯৭৬ সালে একটি বই প্রকাশ হওয়ার পর। বইটির লেখক একজন সাংবাদিক বিল কেসিং। নাসার একটি ঠিকাদার কোম্পানির জনসংযোগ বিভাগে তিনি কিছুদিন কাজ করেছিলেন। তার বইটির নাম ছিল, "উই নেভার ওয়েন্ট টু মুন: আমেরিকাস থার্টি বিলিয়ন ডলার সুইন্ডল।" 

লেখকের মূল বক্তব্য হচ্ছে, মানুষ কখনো চাঁদে যায়নি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আসলে তিন হাজার কোটি ডলারের প্রবঞ্চনা করা হয়েছে। 

এই বইতে এমন কিছু বিষয় তুলে ধরা হয়েছিল যা পরবর্তী বছরগুলোতে ''চন্দ্র অভিযানের'' সাফল্যে অবিশ্বাসীরা এই বিতর্কে সবসময় উল্লেখ করেছেন। 

চাঁদের বাতাসহীন পরিমন্ডলে পতাকা উড়লো কীভাবে
নিল আর্মস্ট্রং আর অলড্রিনের পুঁতে আসা পতাকাটি কুঁকড়ে আছে।
কিছু ছবি দিয়ে তারা এই উদাহারণটি দেয়ার চেষ্টা করেন। তাদের প্রশ্ন, চাঁদে তো বাতাস নেই, তাহলে সেখানে মার্কিন পতাকা উড়লো কেমন করে। তাদের আরও প্রশ্ন, কেন এই ছবিতে চাঁদের আকাশে কোন তারামন্ডল দেখা যাচ্ছে না। 

এই ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে নাকচ করে দেয়ার মতো অনেক বৈজ্ঞানিক যুক্তি আছে, বলছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার মাইকেল রিক। তিনি বলেন, নিল আর্মস্ট্রং এবং বাজ অলড্রিন যখন পতাকাটি খুঁটি দিয়ে চাঁদের মাটিতে লাগাচ্ছিলেন, তখন সেটি কুঁচকে গিয়েছিল। আর যেহেতু পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ছয় গুণ কম, তাই কুঁচকানো পতাকাটি সেরকমই থেকে গিয়েছিল। 

চাঁদের আকাশে কেন তারা নেই
চাঁদের আকাশে কেন তারা দেখা যাচ্ছে না, সেটি নিয়ে অনেকের প্রশ্ন।
চাঁদের আকাশে কেন তারা দেখা যাচ্ছে না, সেটি নিয়ে অনেকের প্রশ্ন। চাঁদে যাওয়ার কথা যারা অস্বীকার করেন, তারা প্রমাণ হিসেবে এই বিষয়টির কথা উল্লেখ করেন। তাদের প্রশ্ন, কেন চাঁদে নামার এই ছবির পেছনের আকাশে কোন নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে না। 

বাস্তবে আসলে এই ছবিতে উজ্জ্বল আলো এবং অন্ধকারের একটা বিরাট পার্থক্যই চোখে পড়ে। 

এটা কেন? রচেস্টার ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অ্যাস্ট্রো ফিজিক্সের অধ্যাপক ব্রায়ান কোবারলিন বলেন, এর কারণ, চন্দ্রপৃষ্ঠ থেকে সূর্যের আলো প্রতিফলিত হয়। সে কারণে ছবিতে এত উজ্জ্বলতা চোখে পড়ছে। আর এই উজ্জল আলোর কারণেই পেছনের আকাশের তারকার আলো ম্লান হয়ে গেছে। এ কারণেই অ্যাপোলো ১১ মিশনের ছবিতে চাঁদের আকাশে কোন তারা দেখা যায় না। কারণ এসব তারার আলো খুবই দুর্বল। আর ক্যামেরার এক্সপোজার টাইমও হয়তো ছিল অনেক বেশি। 

নকল পায়ের ছাপ
নিল আর্মস্ট্রং এর বুটের ছাপ। চাঁদে যেহেতু বাতাস নেই, তাই এই ছাপ থেকে যাবে লাখ লাখ বছর।
নভোচারীরা চাঁদের বুকে যে পায়ের ছাপ রেখে এসেছিলেন, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এ নিয়ে সন্দেহপোষণকারীরা। 

তাদের কথা হচ্ছে, চাঁদে কোন আর্দ্রতা নেই। কাজেই বাজ অলড্রিনরা সেখানে যে পায়ের ছাপ রেখে এসেছেন, সেগুলো হওয়ারই কথা নয়। 

এর প্রত্যুত্তরে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিলেন আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মার্ক রবিনসন। 

"চাঁদের মাটি এক ধরণের পাথর আর ধূলায় ঢাকা, যার নাম 'রেগোলিথ।' এই স্তরটি খুবই ফাঁপা, এবং পা রাখলেই তা ডেবে যায়। আর মাটির কণাগুলো যেহেতু একটার সঙ্গে একটা লেগে থাকে, তাই জুতোর ছাপ পড়ার পর সেটি সেভাবেই থেকে যায়।" 

মার্ক রবিনসন বলেন, চাঁদের বুকে নভোচারীদের এই পায়ের ছাপ থেকে যাবে লক্ষ লক্ষ বছর, কারণ সেখানে যেহেতু কোন বায়ুমন্ডল নেই, তাই কোন বাতাসও নেই। 

তেজস্ক্রিয়তায় নভোচারীরা মারা যাওয়ার কথা' 
আরেকটি জনপ্রিয় ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হচ্ছে, পৃথিবীকে ঘিরে যে তেজস্ক্রিয়তার পরিমন্ডল, সেটিতে নভোচারীদের মারা যাওয়ার কথা। তারা কীভাবে চাঁদে যেতে পারে? 

পৃথিবীকে ঘিরে এই তেজস্ক্রিয় অঞ্চলটিকে বলে 'ভ্যান অ্যালেন বেল্ট' এবং সৌর ঝড় আর পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্রের নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় এই তেজস্ক্রিয়তার সৃষ্টি হয়। 

মহাকাশ অভিযান নিয়ে যখন প্রতিযোগিতা শুরু হলো, তখন এই বিকীরণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যেও উদ্বেগ ছিল। তাদের আশংকা ছিল মানুষ মারাত্মক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তার শিকার হতে পারে। 

তবে নাসার বিজ্ঞানীদের মতে, অ্যাপোলো-১১ এর ক্রু যারা ছিলেন, চাঁদে যাওয়ার সময় তারা ভ্যান অ্যালেন বেল্টে ছিলেন মাত্র দুই ঘন্টা। আর এই বেল্টের যে অঞ্চলটিতে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সবচেয়ে বেশি, সেখানে তারা অবস্থান করেন পাঁচ মিনিটেরও কম। ফলে তাদের ওপর তেজস্ক্রিয়তার সেরকম প্রভাব একেবারেই পড়েনি। 

বাকী ষড়যন্ত্র তত্ত্ব যেভাবে নাকচ করে দিল চাঁদের নতুন ছবি
২০১২ সালে নাসার প্রকাশ করা ছবিতে দেখা যাচ্ছে অ্যাপোলো-১১ এর লুনার মডিউলের পড়ে থাকা অংশ

চাঁদে পরবর্তীকালে যেসব নভোযান পাঠানো হয়েছে সেগুলো থেকে অ্যাপোলোর ল্যান্ডিং সাইটের অনেক ছবি তোলা হয়েছে। নাসা সেসব ছবি প্রকাশও করেছে। 

২০০৯ সাল থেকে চাঁদকে প্রদক্ষিণ করছে এরকম একটি নভোযান। সেটি থেকে তোলা ছবি স্পষ্টই প্রমাণ করে যে চাঁদে আসলেই মানুষ নেমেছিল। 

অ্যাপোলো-১১ যেখানটায় নেমেছিল, ঠিক সেখানকার কিছু ছবিতে ঐ অভিযানের অনেক প্রমাণ চোখে পড়ছে। মাটির ওপর ছাপ তো আছেই, আরও আছে লুনার মডিউলের পড়ে থাকা অংশ। 

শুধু তাই নয়, ছয় জন মার্কিন নভোচারী চাঁদে যে মার্কিন পতাকা গেড়ে এসেছিলেন, সেগুলো এখনো আছে। সেই পতাকার ছায়াও ধরা পড়েছে ছবিতে। 

তবে একটি পতাকা আগের জায়গায় নেই। বাজ অলড্রিন জানিয়েছেন, তাদের লুনার মডিউল যখন ফিরে আসার জন্য চাঁদের বুক থেকে উঠছিল, তখন ইঞ্জিনের নির্গত ধোঁয়ায় সেটি পড়ে যায়। 

যদি মার্কিনীরা সত্যিই চাঁদে না গিয়ে থাকে, তাহলে সোভিয়েতরা কেন এরকম একটি সাজানো ঘটনায় বিশ্বাস করবে? 

উপরের প্রতিটি ষড়যন্ত্র তত্ত্বই অসার প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু তারপরও এগুলোতে এখনো বিশ্বাস করে অনেক মানুষ। 

কিন্তু বাস্তব সত্য হচ্ছে, ১৯৬৯ সালের ২০শে জুলাই নিল আর্মস্ট্রং চাঁদের মাটিতে পা রেখেছিলেন। 

চাঁদে মানুষের সফল অভিযান সম্পর্কে যারা নানা রকম ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়ান, তাদেরকে একটা প্রশ্ন সব সময় করা হয়। 

তা হলো, যেখানে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের তীব স্নায়ু যুদ্ধ আর চাঁদে মানুষ পাঠানোর প্রতিযোগিতা চলছে, সেখানে তারা কেন মার্কিনীদের সাজানো ঘটনা মেনে নেবে। 

নাসার সাবেক এক ইতিহাসবিদ রবার্ট লনিয়াস বলেন, "আমরা যদি চাঁদে না গিয়ে থাকি এবং এরকম নাটক সাজিয়ে থাকি, তাহলে সোভিয়েতদের তো সেটা ফাঁস করে দেয়ার সক্ষমতা এবং ইচ্ছে দুটিই ছিল।" 

"কিন্ত তারা তো একটি শব্দও বলেনি এনিয়ে। সেটাইতো এর পক্ষে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।"

বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ছয়মাস পরে নির্বাচন কমিশন কেন্দ্রভিত্তিক যে ফলাফল প্রকাশ করেছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে অন্তত ১৯৭ কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদাও স্বীকার করেছেন, শতভাগ ভোট পড়া স্বাভাবিক ঘটনা নয়।
ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, অন্তত ১৮৮৯ কেন্দ্রে ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ ভোট পড়েছে।
একাশদ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আগের রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি এবং ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দ্বারা ভোটারদের বাধা দেয়াসহ নানা অভিযোগ রয়েছে।
ভোট কেন্দ্রের এ চিত্র নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য কী অর্থ বহন করছে?



প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের ছবির পাশে শিরোনামটি ছিল : 'সাতটি দেশে বড় ব্যবধানে এগিয়ে'। বিবিসি আরবি বিভাগ পরিচালিত যে জরিপটি গত মঙ্গলবার প্রকাশিত হয়েছে, সেটিকে এভাবেই প্রথম পাতায় তুলে ধরেছে তুরস্কের সরকার-পন্থী পত্রিকা আকসাম। যদিও তুরস্কে এরদোয়ানের দীর্ঘ শাসনামল বড় ধরণের ধাক্কা খেয়েছে ইস্তানবুলের মেয়র নির্বাচনে পরাজয়ের মধ্য দিয়ে। তবে বিবিসির এই জরিপ মি: এরদোয়ানের সমর্থকদের জন্য কিছু সান্ত্বনা আনবে। মি: এরদোয়ানের একে পার্টি যখন ইস্তানবুলের মেয়র নির্বাচনে পরাজয়ের ক্ষত নিরাময়ের চেষ্টা করছে, তখন আরব বিশ্বে তুরস্ক নেতার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আরো ভালো খবর নিয়ে এসেছে এই জরিপ। এই জরিপে সবগুলো আরব দেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তবে এ পর্যন্ত পরিচালিত জরিপগুলোর মধ্যে এটি সবচেয়ে বড়। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আফ্রিকা এবং ফিলিস্তিনসহ ১০টি দেশে ২৫ হাজারের বেশি মানুষের উপর এ জরিপ চালানো হয়েছে। জরিপে তাদের কাছে নানা বিষয়ের উপর জানতে চাওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালের শেষ দিকে থেকে শুরু করে ২০১৯ সালের বসন্তকালে পর্যন্ত এ জরিপের সময়কাল ছিল।

২০০২ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন মি: এরদোয়ান

গ্রহণযোগ্যতা 
আরব দেশগুলোর জনগন আমেরিকা, রাশিয়া এবং তুরস্কের নেতাদের কতটা ইতিবাচক ভাবে দেখে সে বিষয়ে মতামত জানতে চাওয়া হয়েছিল জরিপে। ফলাফলে দেখা গেছে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অবস্থান সবার নিচে এবং রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দ্বিতীয় অবস্থানে। কিন্তু তাদের দুজনের সম্মিলিত গ্রহণযোগ্যতা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট মি: এরদোয়ানের ধারে-কাছেও নেই। ১১টি দেশের মধ্যে সাতটি দেশে ৫০ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা মি: এরদোয়ানের পক্ষে মতামত দিয়েছেন। প্রথম দেখায় এটা স্বাভাবিক মনে হতে পারে যে আরব দেশের মানুষ তাদের মতোই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আরেকটি দেশ তুরস্কের নেতৃত্বের প্রতি সহানুভূতিশীল হবে। কিন্তু ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা।
কঠিন ইতিহাস তুরস্ক এবং আরব - এ দুটো ভিন্ন জাতি। তাদের ভাষাও আলাদা। তুরস্কের অটোম্যান সাম্রাজ্য কয়েকশ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার একটি বড় অংশ শাসন করেছে। সে সময় তারা আরব দেশের জনগণকে অধিকার বঞ্চিত করেছে। বর্তমানে আরব দেশগুলোর অন্যতম বিখ্যাত শহর হচ্ছে লেবাননের রাজধানী বৈরুত। এ জায়গাটির 'মার্টার্স স্কয়ার' বা 'শহীদ চত্বর' ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। তুরস্কের অটোম্যান শাসকদের দ্বারা আরব জাতীয়তাবাদীদের হত্যার স্মৃতি বহন করছে এই চত্বর। অটোম্যান সাম্রাজ্যের পতনের পরেও সম্পর্কের কোন উন্নতি হয়নি। অটোম্যান সাম্রাজ্যেরে ভস্ম থেকে জন্ম নিয়েছে তুরস্ক প্রজাতন্ত্রের। ইস্তানবুলে খিলাফত বিলুপ্ত করে ধর্মনিরপেক্ষতার পথ বেছে নিয়েছে তুরস্ক প্রজাতন্ত্র। এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামপন্থীদের বড় ধাক্কা দিয়েছিল। নতুন তুরস্কের গোড়াপত্তনের পর আরবি বর্ণমালা উঠিয়ে দেয়া হয় এবং ল্যাটিন বর্ণমালা চালু করা হয়। এর মাধ্যমে তুরস্ক পাশ্চাত্য-মুখি হয়ে উঠার পরিষ্কার ইঙ্গিত দেয়। তুরস্কের সেনাবাহিনী, যারা ধর্মনিরপেক্ষতায় ছিল প্রতিশ্রুতি-বদ্ধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ইসরায়েলের সাথে সে অঞ্চলে যৌথ সামরিক মহড়া করতো তুরস্ক। কিন্তু সেসব দিন এখন আর নেই।
তুরস্ক এবং ফিলিস্তিনের পতাকা সমৃদ্ধ স্কার্ফ নিয়ে তুরস্কের এক র‍্যালিতে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান।

ইসরায়েলের সমালোচক 
২০০২ সালে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের জাস্টিস এন্ড ডেভেলপমেন্টে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর তুরস্কের সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পরিচয় আবারো ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়ে। মুসলিম বিশ্বের সাথে ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরায় জাগিয়ে তোলেন তিনি। তুরস্কের অর্থনীতির স্বার্থে আরব দেশগুলোর সাথে ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ইচ্ছে ছিল। বর্তমান তুরস্কে দেশটির সেনাবাহিনী পুরোপুরি বেসামরিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান প্রকাশ্যে আমেরিকার সাথে দ্বিমত পোষণ করেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে 'একটি সন্ত্রাসী দেশের নেতা' হিসেব টুইটারের মাধ্যমে উল্লেখ করেন মি: এরদোয়ান। ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের অবরোধ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। গাজাকে একটি 'উন্মুক্ত কারাগার' হিসেবে বর্ণনা করেছেন তিনি। পর্যবেক্ষক মারওয়ান মুয়াশের মনে করেন, ইসরায়েলকে নিয়ে মি: এরদোয়ানের এসব বক্তব্য ফিলিস্তিন এবং জর্ডানে তাঁর ভক্ত বাড়িয়েছে। তিনি বলেন, "এরদোয়ানকে দেখা হয় এমন এক ব্যক্তি হিসেবে যিনি ইসরায়েল এবং আমেরিকার সামনে দাঁড়িয়েছেন এবং নিজ দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছেন। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে তুরস্ক এখন ভালো অবস্থানে নেই। এরদোয়ান এখন কর্তৃত্ববাদী পথ বেছে নিয়েছেন।"
গাজার একটি সমুদ্র সৈকতে মি: এরদোয়ানের ছবি প্রমাণ করে ফিলিস্তিনিদের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা।

বিনয়ী সূচনা 
তুরস্কের একজন বিশ্লেষক ফেহিম তাসতেকিন, যিনি মধ্যপ্রাচ্যে পড়াশুনা করেন, মনে করেন ইসরায়েলের সাথে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের যে অচলাবস্থা সেটি বাস্তবে যা দেখা যাচ্ছে তার চেয়েও জটিল। তিনি বলেন, "বাণিজ্যিকভাবে তুরস্ক এবং ইসরায়েলের সম্পর্ক নীরবে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আরব দেশের জনগণ এবং তুরস্কের রাস্তায় মি: এরদোয়ান আবির্ভূত হয়েছেন এমন একজন নেতা হিসেবে যিনি ইসরায়েলের সমালোচনা করেন।" "কোন পশ্চিমা নেতার মধ্যে তারা এ বিষয়টি লক্ষ্য করেন না" মি: এরদোয়ানের উঠে আসার গল্প তুরস্কের বহু মানুষকে আন্দোলিত করে। একটি ধার্মিক পরিবারে জন্ম নেয়া এরদোয়ান তুরস্কের ধর্মনিরপেক্ষ শাসক গোষ্ঠীকে চ্যালেঞ্জ করেছেন এবং তুরস্কের নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন।

অটোম্যান সাম্রাজ্যের সৈনিকদের আদলে পোশাক পরিহিত গার্ডদের নিয়ে মি: এরদোয়ান যখন প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে প্রবেশ করেন তখন বিষয়টি দেখে অনেকে বিস্মিত হয়েছেন।

মিশরে অস্থিরতা 
"সুদানের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশিরের শাসনামলে দেশটি যখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, তখন দেশটিতে তুরস্ক বিনিয়োগ করেছিল। এজন্য সুদানের মানুষ কৃতজ্ঞ," বলছিলেন ফেহিম তাসতেকিন। কিন্তু এই জরিপের ফলাফলে দিকে যদি গভীর মনোযোগ দেয়া যায়, তাহলে দেখা যাচ্ছে আরব বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ মিশরের মানুষ তুরস্কের নেতৃত্বকে নিয়ে সন্দেহ করে। মিশরের মাত্র ১৫ শতাংশ মানুষ এরদোয়ানের পক্ষে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি এবং তুরস্কের নেতা এরদোয়ানের মধ্যে যে উত্তেজনা চলছে এটি তারই প্রতিফলন। আরব ব্যারোমিটারের সিনিয়র গবেষক মাইকেল রবিনস মনে করেন, " তুরস্কের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা ব্যাপকভাবে কমে গেছে মিশর এবং লিবিয়ায়। এ দুটো দেশে ইসলামপন্থীদের বিপক্ষে মনোভাব তৈরি হয়েছে।" প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বেশ স্পষ্টভাবে মিসরের মুসলিম ব্রাদারহুডের পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। হুসনি মোবারকের পতনের পর মিশরে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত অবাধ নির্বাচনে জয়ী হয়ে স্বল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় ছিল মুসলিম ব্রাদারহুড। এরদোয়ান ইসলামি ভাবধারা উঠে এসছেন। তাঁর চিন্তাধারার সাথে মিলে যায় মিশরের নির্বাচনের ফলাফল। সে নির্বাচনের মাধ্যমে ইসলামপন্থী মুসলিম বাদ্রারহুড ক্ষমতায় আসে। কিন্তু মোহাম্মদ মোরসি সরকারের বিরুদ্ধে গণ আন্দোলনের পর সেনাবাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল সিসি। জেনারেল সিসির সাথে মি: এরদোয়ানের বৈরিতার কোন পাল্টা জবাব ছাড়া শেষ হয়নি। মাইকেল রবিনসন বলেন, " মিশরে সরকার নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমে তুরস্কের নেতাকে নেতিবাচক-ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেজন্য মিশরে এরদোয়ানের খারাপ ফল হয়েছে জরিপে।" "মিশরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মি: এরদোয়ান পরিষ্কারভাবে একটি পক্ষ নিয়েছিলেন," বলেন ফেহিম তাসতেকিন। সেজন্য এরদোয়ান সম্পর্কে মিশরের মানুষের মতামত অনেক বেশি বিভক্ত।
চার আঙ্গুলে স্যালুট , যেটি রাবা নামে পরিচিত, ২০১৩ সালে মিশরে মুসলিম ব্রাদারহুড সমর্থকরা এটি চালু করেছে।

মডেল দেশ 
শুধু মিশর এবং লিবিয়া নয়, ইরাকের ক্ষেত্রেও এটি হয়েছে। গোষ্ঠি সংঘাতে বিপর্যস্ত ইরাক। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান সুন্নি মুসলিমদের পক্ষ নিয়েছেন। এ কথা মনে রাখা দরকার যে একটা সময় পশ্চিমা দেশগুলো মি: এরদোয়ানকে সম্পর্ক অনেক উচ্চ ধারণা পোষণ করতো। ২০১১ সালে যখন আরব বসন্তের সূচনা হয় তখন সে অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকে উঁচু আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম তুরস্ককে একটি 'মডেল দেশ' হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। সে বছর ফেব্রুয়ারি মাসে নিউইয়র্ক টাইমস মন্তব্য করেছিল যে তুরস্ক হচ্ছে একটি 'শক্তিশালী গণতন্ত্রের' দেশ যেখানে প্রকৃতপক্ষে একজন নির্বাচিত নেতা আছে। এছাড়া তুরস্কের অর্থনীতি সমগ্র আরব অর্থনীতির প্রায় অর্ধেকের সমান বলে মন্তব্য করেছিল নিউইয়র্ক টাইমস। আট বছর পরে সে আশাবাদের সামন্য কিছু অবশিষ্ট আছে।

'মরিয়া হয়ে ওঠা' 
মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রের সূচকে তুরস্কের অবস্থান ক্রমাগত নিচের দিকে যাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটির অর্থনৈতিক অবস্থাও বেশ টালমাটাল। তুরস্কের গণতন্ত্রকে সামরিক বাহিনীর প্রভাবমুক্ত করার জন্য এক সময়ে পশ্চিমা বিশ্বে যারা মি: এরদোয়ানের প্রশংসা করতেন, তারা এখন মি: এরদোয়ানের সমালোচনা করছেন। পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের তুলনায় তুরস্কে বহু সাংবাদিককে কারাগারে যেতে হয়েছে। "আরব বিশ্ব এখনো তার দিকে তাকিয়ে আছে। কারণ তারা অন্য কোন মুসলিম নেতা দেখছেন না যিনি গণতন্ত্রের স্বপ্ন এবং ভালো ভবিষ্যতের মাধ্যমে তাদের অনুপ্রাণিত করতে পারেন," বলছিলেন ফেহিম তাসতেকিন। অধিকাংশ আরব এখনো এরদোয়ানের সাথে আছে। এ বিষয়টিকে 'মরিয়া হয়ে ওঠার প্রতীক' হিসেবে দেখছেন ফেহিম তাসতেকিন।
বাঙালি ইতিহাসমনস্ক নয়, এমন অভিযোগ আছে। পাল্টা নালিশও আছে যে বাঙালি অতীতচারী। পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটতেই সে পছন্দ করে, সামনের দিকে তাকানোর তার সময় কই। দুটোই সত্য। আমরা অতীত থেকে শিখি না। অতীতের নির্যাসটুকু পাথেয় হিসেবে ঝুলিতে ভরে ভবিষ্যতের পথ তৈরি করি না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে এমনটিই মনে হয়।

একসময় ভারত নামে ইংরেজদের বিশাল এক উপনিবেশ ছিল। ইংরেজ চলে গেছে। ভারত তিন টুকরা হয়ে এখন হিন্দুস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ নামে মানচিত্রে বহাল আছে। ইংরেজরা তাদের উপনিবেশগুলোতে সীমিত আকারে গণতন্ত্রের চর্চা করত। এতে অনেক লাভ ছিল। জনবিক্ষোভ প্রশমিত রাখার জন্য স্পেস তৈরি হতো। এভাবেই তৈরি হয়েছিল ১৮৮৫ সালে ভারতের জাতীয় কংগ্রেস এবং ১৯০৬ সালে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। ১৯৩০-এর দশকে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে বাংলা মুলুকে কৃষক-প্রজা পার্টি বেশ জোরকদমে এগিয়েছিল। কংগ্রেসে টিকতে না পেরে সুভাষ চন্দ্র বসু তৈরি করেছিলেন ফরোয়ার্ড ব্লক। তাঁদের অবর্তমানে ওই দলগুলো হারিয়ে গেছে। পুরোনো উল্লেখযোগ্য আরেকটি দল হলো কমিউনিস্ট পার্টি। এটা কখনোই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। এলিটিস্ট নেতৃত্বের এই দলটি খণ্ডবিখণ্ড হয়ে এখন সিন্দুকে ঠাঁই পেয়েছে।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় জন্ম নিয়েছিল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। আজ তার বয়স সত্তর। সময়ের বিচারে দলটি নিঃসন্দেহে প্রবীণ। নানা চড়াই-উতরাইয়ের মধ্য দিয়ে এই দলটি এখনো প্রবল প্রতাপে ক্ষমতার কেন্দ্রে টিকে আছে। একদা মহা পরাক্রমশালী কংগ্রেস এখন হিন্দুস্তানের রাজনীতিতে রীতিমতো কোণঠাসা। সেখানে নবশক্তির উত্থান হয়েছে। মুসলিম লীগের প্রদীপ পাকিস্তানে নিবুনিবু। বাংলাদেশে (একদা পূর্ব বাংলায়) এই দলটির দাফন হয়ে গিয়েছিল ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ কেন ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ছিটকে পড়ল, কমিউনিস্ট পার্টি কেন রাষ্ট্রক্ষমতা হাতের মুঠোয় পুরতে পারল না, কেন আওয়ামী লীগ এখনো নিজ বলয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ধরে রাখতে পারছে, এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা হতে পারে।

একটা কথা সত্য যে আওয়ামী লীগ ক্রমাগত নিজেকে বদলে দিচ্ছে। আজকের প্রজন্ম হয়তো জানেও না, কারা কীভাবে আওয়ামী লীগ তৈরি করেছিল। এ নিয়ে বেশ কিছু কিতাব থাকলেও কে আর ওই সব পড়ে। হাতের তালুতে আছে উইকিপিডিয়া। সেখানে হঠাৎ করেই কেউ যদি ঢুঁ মারে, সে কিছু তথ্য পেয়ে যেতে পারে। তবে উইকিপিডিয়ার তথ্যের সত্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে অনেক।
পুরান ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে ছিল মুসলিম লীগের ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ বা কর্মী শিবির। কলকাতা এবং ঢাকায় যারা মুসলিম লীগের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের সমর্থক-ভক্ত ছিলেন, তাঁরা চালাতেন এই কর্মী শিবির। মুসলিম লীগের বিক্ষুব্ধ তরুণেরা তখন ঢাকার নবাববাড়িকেন্দ্রিক মুসলিম লীগ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছিলেন। তাঁদের এই পথচলা গিয়ে থামে টিকাটুলীর কে এম দাস লেনে অবস্থিত রোজ গার্ডেনে। মুসলিম লীগের গণতন্ত্রায়ণের দাবিতে তাঁরা তৈরি করেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ বাদ পড়ে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জায়গায় আসে বাংলাদেশ।

২৩ জুন (১৯৪৯) বেলা তিনটায় রোজ গার্ডেনের দোতলার হলঘরে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে মুসলিম লীগ কর্মীদের এক অধিবেশনে তৈরি হয় এই ইতিহাস। দলের নাম প্রস্তাব করেছিলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তিনিই দলের ৪০ জনের একটি সাংগঠনিক কমিটি ঘোষণা করেছিলেন। তিনি সভাপতি, টাঙ্গাইলের যুবনেতা সামসুল হক সাধারণ সম্পাদক। পাঁচজন সহসভাপতির মধ্যে ছিলেন আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমেদ খান, আলী আমজাদ খান এবং আবদুস সালাম খান। কোষাধ্যক্ষ ছিলেন ইয়ার মোহাম্মদ খান। যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান তখন কারাবন্দী। তাঁকে কার্যনির্বাহী কমিটির যুগ্ম সম্পাদক করা হয়। এটি করা হয়েছিল মাওলানা ভাসানীর আগ্রহে ও চাপে। তিনি শেখ মুজিবের পেছনে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছিলেন। জানি না, সত্তর বছর পরে দলের নেতা-কর্মীরা দলের প্রতিষ্ঠাতাদের স্মরণ করেছেন কি না।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কমিটির প্রথম সভা হয়েছিল ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে। সামসুল হকের লেখা ‘মূল দাবি’ অনুসরণ করে দলের খসড়া ঘোষণাপত্র তৈরি হয়েছিল। এরপর দলের প্রথম অফিসটি চালু হয় ইয়ার মোহাম্মদ খানের ১৮ নম্বর কারকুনবাড়ি লেনে। মাওলানা ভাসানী ঢাকায় এলে এ বাড়িতেই থাকতেন। পরে আওয়ামী লীগের অফিস নেওয়া হয় সিমসন রোডে এবং পরে ৯৪ নম্বর নবাবপুর রোডে। সেখান থেকে পুরানা পল্টন হয়ে আওয়ামী লীগ অফিস এখন বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে।
আওয়ামী লীগের পথচলা শুরু হয় গণতন্ত্রের দাবিতে। এরপর এর সঙ্গে যোগ হয় আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি। প্রধানত এ দুটো দাবি নিয়েই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ জনসম্পৃক্ত রাজনীতির শক্ত ভিত তৈরি করতে পেরেছিল, সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে পেরেছিল এর ব্যাপ্তি। সত্তরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিপুল ম্যান্ডেট এসেছিল এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই। তবে এ কথা স্বীকার করতেই হবে, আওয়ামী লীগ তৃণমূলে ছড়িয়ে পড়লেও সাংগঠনিকভাবে ততটা শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রায়ই বলতেন, তাঁর মূল শক্তি হলো ছাত্রলীগ। তিনি আওয়ামী লীগের নেতা থেকে রূপান্তরিত হলেন জাতীয় নেতায়। তিনি হলেন ‘বঙ্গবন্ধু’। দলকে ছাড়িয়ে তিনি তখন অনেক ওপরে। দল তাঁকে ধারণ করতে পারেনি। যে যুবশক্তি এবং জনগোষ্ঠী তাঁকে ‘জাতির পিতার আসনে বসিয়েছিল, তাঁরা তাঁকে রক্ষা করতে পারেনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে। বাঙালি জাতির প্রাণভোমরা এখন আওয়ামী লীগের লোগো। আওয়ামী লীগের নেতারা এখন নতুন করে ইতিহাসের কথা বলছেন। সেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে সরকারি ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণও। আমরা দেখছি, দলের প্রচারে থাকে সংকীর্ণতা, আত্মসন্তুষ্টি।

আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ছিল, তখন ছিল তার এক ধরনের রূপ। তাতে ধৈর্য ছিল, গতি ছিল, ত্যাগ ছিল, স্বপ্ন ছিল। দলটি সরকারে যাওয়ার পর থেকেই এটি বদলে যেতে থাকে। মাঠের রাজনীতি আর রাষ্ট্র পরিচালনা যে এক বিষয় নয়, এটা তাঁরা অনেক সময় বুঝতে চান না। যে কথা যে ভাষায় পল্টন ময়দানের মঞ্চে বলা যায়, সেটি সংসদ অধিবেশনে বলা যায় না। দেশটা এগিয়েছে অনেক। রাজনৈতিক দলগুলো সে অনুযায়ী এগোয়নি, আওয়ামী লীগও নয়।
টানা দশ বছরেরও বেশি ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। এখন দল, সরকার ও রাষ্ট্র একাকার। দল সরকার চালায় না। সরকার দল চালায়। ক্ষমতার কেন্দ্র এখন ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ নয়, যেমনটি ছিল ১৯৭০-৭১ সালে ৫১ পুরানা পল্টন।

শরৎচন্দ্রের বিলাসী গল্পে পড়েছিলাম, ‘টিকিয়া থাকাটাই চরম সার্থকতা নহে। অতিকায় হস্তী লোভ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে।’ আওয়ামী লীগ সরকার টিকে থাকবে ততদিন, যতদিন দলটির পক্ষে দুটো শর্ত কাজ করবে। এক, রাষ্ট্রশক্তির নিরঙ্কুশ সমর্থন। দুই. চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো সক্ষম রাজনৈতিক বিকল্প দৃশ্যমান না হওয়া। শর্তগুলো এখনো আওয়ামী লীগের পক্ষে।

মহিউদ্দিন আহমদ : লেখক ও গবেষক
mohi2005@gmail.com

সৌজন্যে - প্রথম আলো
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর চেয়ে ৫৭ হাজার ভোট বেশি পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন, এটি অবিশ্বাস্য ঘটনা নয়। বরং ফলাফল উল্টো হলেই অবিশ্বাস্য মনে হতো। আবার এখানে আওয়ামী লীগ প্রার্থী টি জামান নিকেতা যে ৩২ হাজার ভোট পেয়েছেন, তাতে প্রমাণ করে না যে সারা দেশে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিএনপির কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবেন।

বহু বছর ধরে বগুড়া বিএনপির শক্ত ঘাঁটি। ১৯৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বগুড়ার সাতটি আসনই বিএনপির দখলে ছিল; যেমন গোপালগঞ্জের সব আসন আওয়ামী লীগ পেত, এখনো পাচ্ছে, ভবিষ্যতেও পাবে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মহাবিজয়ের সময়ও বিএনপি বগুড়ায় পাঁচটি আসন ধরে রেখেছিল। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনে বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি বগুড়ায় দুটি করে আসন পায়। একটি পান স্বতন্ত্র প্রার্থী।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে এই আসনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পেয়েছিলেন ২ লাখ ৫ হাজার ৯৮৭ ভোট এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী জাতীয় পার্টির নুরুল ইসলাম ওমর পান ৩৯ হাজার ৯৬১ ভোট। বগুড়ার সাংবাদিক বন্ধুরা বলেছেন, ৩০ ডিসেম্বর বগুড়া-৬ আসনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। অন্যান্য আসনে বিরোধী দলকে নানাভাবে নাজেহাল করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু দলীয় সংহতির স্বার্থে মির্জা ফখরুল শপথ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে আসনটি শূন্য হয়ে যায়। যদিও বিএনপির অপর সাত বিজয়ী প্রার্থী শপথ নিয়েছেন এবং সংসদেও গিয়েছেন।

বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচন বিশ্লেষণ করলে আমরা যেসব বৈশিষ্ট্য পাই, তা হলো: এই নির্বাচনে ভোটার কেন্দ্রে উপস্থিত না থাকলেও কমিশন ভোটের হার অবিশ্বাস্য রকম বাড়িয়ে দেয়নি। ভোটের আগের দিন বিরোধী দলের প্রার্থী এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানো হয়নি। ভোটের দিন সকালে সরকারি দলের প্রার্থীর পক্ষে কাউকে সশস্ত্র মহড়া দিতেও দেখা যায়নি। ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৩৪ শতাংশ, যা ৩০ ডিসেম্বরের অর্ধের কিছু বেশি। ৩০ ডিসেম্বর ভোট পড়েছিল ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ। এই নির্বাচনের ফলাফলের সঙ্গে মাঠের ভোটচিত্রের খুব একটা ফারাক নেই।

এই প্রেক্ষাপটে নির্বচন কমিশন বগুড়া উপনির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ বলে দাবি করতে পারে। তাদের এ দাবি হয়তো পুরোপুরি অন্যায্য নয়। কিন্তু একটি প্রশ্নটি করতেই হয়, সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের কৃতিত্ব কার? নির্বাচন কমিশনের, না সরকারের? প্রশাসন হস্তক্ষেপ করেনি বলেই নির্বাচনটি সুষ্ঠু হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন যদি এর কৃতিত্ব দাবি করে, তাহলে দ্বিতীয় প্রশ্ন, তারা আগে নির্বাচনগুলো কেন সুষ্ঠু করল না? শুধু জাতীয় নির্বাচন না, সিটি করপোরেশন ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, যেখানেই হুদা কমিশন হাত দিয়েছে, সেখানে নির্বাচনের বারোটা বেজেছে। জনগণ ভোটকেন্দ্রে এক চিত্র দেখেছে। আর কমিশনের ফলাফলে অন্য চিত্র উঠে এসেছে। বগুড়া-৬–এর উপনির্বাচনে সেটি তারা করেনি বলে ধন্যবাদ জানাই। তাহলে এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে অন্তত একটি উপনির্বাচন সুষ্ঠু হলো।
সিইসি কে এম নূরুল হুদা একবার খেদের সঙ্গে বলেছিলেন, ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে না এলে তাঁদের কিছু করার নেই। খুবই হক কথা বলেছেন। নির্বাচন কমিশন তো ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধরে বেঁধে কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে না। কিন্তু ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে না আসা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন যে প্রায় সব ক্ষেত্রে অবিশ্বাস্য ভোটের হার দেখিয়েছে, সেটি ভোটের নামে একধরনের জালিয়াতি। নির্বাচন কমিশনারদের বিবেকের কাছে (যদি আদৌ বিবেক বলে কিছু থেকে থাকে) একটি প্রশ্ন রাখতে চাই, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শতকরা ৮০ ভাগ ভোট পড়েছে বলে যে প্রচার তাঁরা করেছেন, সেটি কি তাঁরা নিজেরা বিশ্বাস করেন?

বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে কোন দলের প্রার্থী জিতেছেন বা কোন দলের প্রার্থী হেরেছেন, তার চেয়েও বড় হলো নির্বাচনটি পরাজিত হয়নি। নির্বাচন কমিশনও কেন্দ্রে ভোটার থাকুক আর না-ই থাকুক, ভোট প্রদানের অবিশ্বাস্য হার ঘোষণা করেনি। বলতে হবে, তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে। কিন্তু এই শুভবুদ্ধি একটি উপনির্বাচনে সীমিত থাকবে, না পরবর্তী সব নির্বাচনে, সেই প্রশ্নের উত্তর একমাত্র নির্বাচন কমিশনই দিতে পারে।

ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী বিএনপি প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের ধানের শীষ পেয়েছেন ৮৯ হাজার ৭৪২ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ মনোনীত টি জামান নিকেতা নৌকা প্রতীকে পেয়েছেন ৩২ হাজার ২৯৭ ভোট। অন্যদিকে, জাতীয় পার্টির প্রার্থী নুরুল ইসলাম ওমরের লাঙ্গল প্রতীকে পড়েছে ৭ হাজার ২২১ ভোট। বগুড়া সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন এবং একটি পৌরসভার ২১টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত বগুড়া সদর আসন। এই আসনে ভোটার ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৪৫৮ জন। এবারে এ আসনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি ছাড়াও মোট ছয়জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ১৪১টি কেন্দ্রে ইভিএম মেশিনে ভোটাররা ভোট দিয়েছেন। ভোট পড়েছে ৩৪ দশমিক ৫৫ শতাংশ। সব দলের প্রার্থীরা বলছেন, বগুড়ার এই আসনে এবার ভোটের চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করেছে এবং সব প্রার্থীকে প্রচার-প্রচারণায় সমানভাবে সহযোগিতা করেছে।
গত ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে ও পরে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে অনেক মামলা হয়েছে। অনেকে পালিয়ে বেড়িয়েছেন। অনেকে গ্রেপ্তার এবং হয়রানির শিকার হয়েছেন। ভোটের দিন সহিংসতা হয়েছে। কিন্তু উপনির্বাচনের আগে বা পরে এসবের কিছুই ঘটেনি। যে কারণে বিজয়ী ও পরাজিত সব প্রার্থী বলেছেন, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে।

নির্বাচন কমিশন কি দেশবাসীকে এই নিশ্চয়তা দিতে পারবে যে ভবিষ্যতে প্রতিটি নির্বাচন বগুড়ার উপনির্বাচনের মতো সুষ্ঠু হবে। পরাজিত প্রার্থীও সেই নির্বাচন সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না।

সোহরাব হাসান: লেখক ও সাংবাদিক।
সৌজন্যে - প্রথম আলো

গত ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং সেখানকার বৌদ্ধধর্মানুসারীরা রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যে ভয়াবহ হত্যা, নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ এবং গ্যাংরেপ চালিয়েছে তা ধারণার চেয়েও ভয়াবহ ও লোমহর্ষক। গেরুয়া পরিহিত বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরাও রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের দলবেঁধে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে। ছেলেমেয়ের সামনে মাকে অথবা বাবা-ভাইকে গাছের সঙ্গে হাতপা বেঁধে তরুণীদের সম্ভ্রম ছিনিয়ে নিয়েছে মিয়ানমার সেনাসদস্য ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী যুবকরা। সেনাসদস্য ও তরুণদের সম্মিলিত যৌননির্যাতনের দাপটে রোহিঙ্গা নারী শিশুদের জীবনবিপন্ন হবার পরও রেহাই দেয়া হয়নি। এরপর তাদের টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলা হয়। জীবন থাকতেই অনেককে মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়। অনেক রোহিঙ্গা তরুণীকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করে গাছের সঙ্গে বেঁধে গ্যাংরেপ চালানো হয়। এমন ঘটনার বীভৎস ছবিও ইন্টারনেটে দেখা গেছে।
গত ২০১৭ সালের আগস্ট থেকে প্রায় ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা জান বাঁচাতে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা সবকিছু ফেলে এসেছেন। অনেক পরিবারের বহু লোককে সেখানকার সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা হত্যা করেছে। মা ও শিশুদের রেপ করে মেরেছে। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে। লুটে নিয়েছে তাঁদের সম্পদ, দোকানপাট ও ব্যবসাবাণিজ্য। যারা চলে এসেছে তাদের প্রাণটা ব্যতীত কিছুই নেই। হাজার হাজার বিধবা ও এতিম শিশু প্রতিবেশীদের সঙ্গে চলে এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে আসিয়ান পার্লামেন্টারিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস (এপিএইচআর) সেসময় জানায়, নিখোঁজ পিতামাতার সংখ্যা ৪৩ হাজার ৭০০। এসংখ্যা কেবল যাদের মা-বাবা সঙ্গে নেই। এর কারণ হচ্ছে এসব মা-বাবাকে মিয়ানমার সেনাসদস্য ও অস্ত্রধারী বৌদ্ধরা হত্যা করেছে অথবা তাঁরা কোথাও রয়েছেন যাদের খোঁজ জানা নেই। এক হিসেবে জানা যায়, নিধনযজ্ঞ শুরুর প্রথম কয়েকদিনেই ৬,৭০০ রোহিঙ্গা নিহত হন।
ফোর্টিফাই রাইটস এর ম্যাথিও স্মিথ বলেন, চলমান নিষ্ঠুরতার মাত্রার প্রকৃত চেহারা উন্মোচন হতে শুরু করেছে নিখোঁজ পিতামাতার সংখ্যার মাধ্যমে। তিনি বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী সেসব অঞ্চলে নিষ্ঠুরতা চালিয়েছ তার প্রত্যক্ষদর্শী এবং যারা পালিয়ে এসেছে তাঁদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য দেয়া হয়েছে। হতে পারে, নিখোঁজ পিতামাতার উল্লেখযোগ্য অংশকেই হত্যা করা হয়েছে। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের আগস্টে যে তিনটি শহরতলী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেখানে নির্বিচারে গণহত্যা ও গ্যাংরেপ চালানো হয়।
উল্লেখ্য, এসোসিয়েটেড প্রেস গত ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে সহিংসতার কেন্দ্র ও দারপিয়িনের কাছে একই স্থানে কমপক্ষে ৫টি গণকবরের বিস্তারিত সাক্ষ্যপ্রমাণ তুলে ধরেছে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা বলেছেন, ওই একটি গ্রামেই নিহত রোহিঙ্গার সংখ্যা মিয়ানমার সরকারের দেয়া নিহতের সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ডেপুটি ডাইরেক্টর (এশিয়া) ফিল রবার্টসন বলেন, সহিংসতায় এ পর্যন্ত ৪০০ নিহত হয়েছে বলে মিয়ানমার সরকারের দেয়া তথ্য একটি ‘বাজে কৌতুক’। প্রকৃত ঘটনা ধামাচাপা দিতে তারা তাদের নিজস্ব অনুসন্ধান চালানো অব্যাহত রেখেছে। আর এটা করা হচ্ছে নিষ্ঠুরতার ঘটনায় স্বাধীন অনুসন্ধানের গুরুত্বকে হালকা করবার জন্য।
গত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ৬ লাখ ৭১ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে শিবিরে গাদাগাদি করে ঠাঁই নিয়েছেন। এদের অনেকেই শরীরে বুলেট ও যৌননির্যাতনের ক্ষত সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। বাংলাদেশের শিবিরে আশ্রয় নেয়াদের ৬০ শতাংশই শিশু। এদের সিংহভাগেরই মা-বাবা নেই। এরা মিয়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক তাদের মা-বোনদের যৌননির্যাতনের শিকার হওয়াসহ আত্মীয়-স্বজনদের হত্যা এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেবার ভয়াবহ দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে।
মালয়েশিয়ান পার্লামেন্ট মেম্বার ও এপিএইচআর এর চেয়ারম্যান চার্লস সান্টিয়াগো বলেন, আমরা অনেক অনেক শিশু প্রত্যক্ষ করেছি, যাদের মা-বাবা উভয়কেই হত্যা করেছে মিয়ানমারের সেনাসদস্য ও তাদের বৌদ্ধ সহযোগিরা। এ হতভাগ্য শিশুদের কক্সবাজার নিয়ে এসেছেন ওদের প্রতিবেশী কিংবা কোনও পথচারী।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, ৫,৬০০ শিশু যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, তারাই এখন তাদের পরিবারের প্রধান বনে গেছে। তারাই এখন ছোটছোট ভাইবোনদের দেখভাল করছে। এছাড়া তাদের উপায়ও নেই। আগে মনে করা হচ্ছিল, ২,৬৮০ শিশু তাদের মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ কিংবা এতিম। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের দেয়া নতুন তথ্য বলছে, এসংখ্যা আরও অনেক বেশি।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলছে, শিবিরের পরিস্থিতি ভয়াবহ। পলিথিন ও কাঁচাবেড়ার ঘর অল্প বৃষ্টিবাতাসে উড়ে যায়। অনেকের মাথার ওপর সামান্য ছাউনিও নেই।
চার্লস সান্টিয়াগো আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, শিবিরগুলো থেকে শুরু হবে মানবপাচার। এর কারণ হচ্ছে, রোহিঙ্গারা ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া কিংবা অন্য যেকোনও দেশে চলে যাবার জন্য বদ্ধপরিকর।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, সেনানির্যাতনের মুখে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা গ্রাম ও জমিতে ঘাঁটি স্থাপন করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। মানবাধিকার সংস্থাটি জানায়, স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
উল্লেখ্য, গত ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বাড়িঘর বাজারহাট বুলডোজার দিয়ে নিশ্চিহ্ন করে দেবার পর সেখানে এখন সেনাঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। রোহিঙ্গাদের জায়গাজমি দখল করে নেয়া হয় সেনাঘাঁটি স্থাপনের নামে। অন্তত ৩ টি সেনাঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে বলে গত ১২ মার্চ এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। -দৈনিক ইত্তেফাক, ১৩ মার্চ, ২০১৮।
বলতে দ্বিধা নেই, মিয়ানমার থেকে এখনও রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢুকছে। সেখানে এখনও জুলুম-নির্যাতন, ধর্ষণ, হত্যা ও অগ্নিসংযোগ অব্যাহত রেখেছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং তাদের সহযোগী বৌদ্ধ অস্ত্রধারীরা। অথচ বিশ্ববাসীকে দেখানো হচ্ছে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফেরৎ নিতে প্রস্তুত হচ্ছে।
জাতিসংঘসহ বিশ্ববাসীর চাপের মুখে বসতভিটা ও দেশ থেকে অবর্ণনীয় নির্যাতন চালিয়ে রোহিঙ্গাদের উচ্ছেদ করে বাংলাদেশে ঠেলে দেবার পর আর যাতে ফেরৎ নিতে না হয় বা রোহিঙ্গারা নিজেই না ফেরে সেজন্য সব ফন্দিফিকির করছে মিয়ানমার সরকার এবং সেনাবাহিনী। নোবেল বিজয়ী মিয়ানমার নেত্রী অং সান সুচি মুখে কুলুপ এঁটে আছেন। বিশ্ব তাঁকে ধিক্কার জানালেও তিনি নির্বিকার। বরং মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেখানকার বৌদ্ধদের নরহত্যা এবং নারীশিশু ধর্ষণের মতো মানবতাবিরোধী কর্মকা- সমর্থন করে যাচ্ছেন। অথচ সেদেশের সেনাশাসিত সরকার যখন তাঁকে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দী করে রেখেছিল তখন বিশ্ববাসী সুচির পক্ষে ছিল সোচ্চার। কী অদ্ভুত দ্বৈতনীতির প্রতিভূ হয়ে দাঁড়ালেন এখনকার মিয়ানমার নেত্রী অং সান সুচি! নিজেকে তিনি এতোটা ‘অশুচি’ করে তুলবেন তা কি কারুর জানা ছিল এদ্দিন?
বৌদ্ধরা তাদের ধর্মবিশ্বাসকে অহিংসার ধর্ম বলেন। বুদ্ধদেবকে অহিংসার দেবতা বা ভগবান বলে সম্মান করেন। পূজো করেন তাঁর। কিন্তু একী নারকীয় আচরণ তাঁর অনুসারীদের? সত্যই লজ্জাজনক মনে হয় গেরুয়া ঘাগরার ভেতর ধারাল কৃপাণ লুকিয়ে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা যখন রোহিঙ্গা নারীশিশু ধর্ষণসহ নরহত্যার হোলিউৎসবে মেতে ওঠেন। বৌদ্ধদের রক্তমাখা হাত দেখে বিবেকবান মানুষের মুখ লুকোবার জায়গা থাকে না।
মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সেখানকার বৌদ্ধসন্ন্যাসীরা ব্রাসফায়ার করে রোহিঙ্গা পুরুষ ও যুবকদের হত্যা করে নদীতে নিক্ষেপ করেছে। কুকুর দিয়ে খাইয়েছে তাদের ক্ষতবিক্ষত লাশ। গণকবর দেয়া হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে। গর্ভবতী রোহিঙ্গানারীদের পেটে লাথি অথবা বেয়নেটের খোঁচা মেরে বাচ্চা বের করে দেয়া হয়েছে। রোহিঙ্গা শিশু, তরুণী কিংবা বৃদ্ধাকেও রেহাই দেয়নি বৌদ্ধ পশুরা। ২০/৩০ জন সেনাসদস্য ও বৌদ্ধ অস্ত্রধারী পর্যায়ক্রমে ঝাঁপিয়ে পড়েছে একেক নারীর ওপর। আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অনেকেরই মাতৃদ্বার। এমন অমানবিক জুলুম-নিপীড়নের শিকার হয়েই রোহিঙ্গারা পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছেন বাংলাদেশে। কবে তারা দেশে ফিরতে পারবেন কে বলবে? ওদেরতো সবই শেষ করে দেয়া হয়েছে সেখানে।
বাংলাদেশ মানবতার খাতিরে সাময়িকভাবে আশ্রয় দিলেও এভাবে আর কদ্দিন সম্ভব হবে রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণ করা? এছাড়াও প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গাশিশু জন্মগ্রহণ করছে শরণার্থীশিবিরগুলোতে। এদের অনেকেই তখন মাতৃগর্ভে আসে মিয়ানমার সেনাসদস্য, বৌদ্ধযুবক ও গেরুয়া ঘাগরা পরিহিত সন্ন্যাসীদের যৌননিপীড়নের ফলে। এখন স্বাভাবিকভাবেই বহু শিশু জন্ম নিচ্ছে প্রতিদিন শিবিরগুলোতে। তার মানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে। পক্ষান্তরে ধীরেধীরে বিদেশি সাহায্য-সহযোগিতা হ্রাস পাচ্ছে। অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে রোহিঙ্গাদের জীবনযাপন। বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা! কীভাবে এদের সামলাবে বাংলাদেশ? রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার সাহায্য পাওয়া যায় বটে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তাও যা আসে তা ওদের কাছে যায় না। অভিযোগ উঠেছে, ওরা পায় মাত্র ২৫ শতাংশ। বাকিটা খায় ভুতে এবং এনজিও কর্মকর্তারা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন যতো বিলম্ব হবে এনজিওগুলো ততো লাভবান হবে। এছাড়া প্রকৃত অর্থে মিয়ানমারও চায় না বিতাড়িত রোহিঙ্গারা আবার নিজবাসভূমে ফিরুক। এই হচ্ছে রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডির রহস্য। রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে মূলত বাংলাদেশ এখন একা। চীন ও রাশিয়া নেই। বৃহৎ প্রতিবেশী দেশটি পাশে না পেছনে তাও রহস্যঘেরা। অর্থাৎ রোহিঙ্গাদের এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে চেয়ে থাকতে হচ্ছে।
লেখক :  ইসমাঈল হোসেন দিনাজী 
 সৌজন্যে : দৈনিক সংগ্রাম
গত শুক্রবার ১৫ মার্চ নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের আল নূর মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ঐ মসজিদের ইমামসহ ৫০ জন মুসল্লি প্রাণ হারিয়েছেন বলে পত্র-পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। এই হামলায় আরো ৪৮ জন আহত হন। হামলাকারী একজন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিক এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। ইউরোপের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় মুসলমানরা সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করছে এবং এর ফলে খ্রিস্টানদের আধিপত্য হ্রাস পাচ্ছে এটাই তার মূল আপত্তি। নিহতদের মধ্যে চারজন বাংলাদেশী ছিলেন। এই সন্ত্রাসী হামলায় দুঃখ ও সহানুভূতি প্রকাশ করে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী এবং পুলিশ প্রধান যে বক্তব্য প্রকাশ করেছেন তা প্রশংসনীয়। এই হামলার ব্যাপারে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন রকমের বিশ্লেষণ প্রকাশিত হচ্ছে। আমি আমার আলোচনায় বর্তমান বিশ্বের জনসংখ্যার কাঠামো এবং অভিভাসন নিয়েই নিউজিল্যান্ড ঘটনার সামান্য বিশ্লেষণের চেষ্টা করবো।
জাতিসংঘের ২০১৭ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, গত ১২ বছরে সারা বিশ্বে মানুষ বেড়েছে ১০০ কোটি এবং তাদের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী আগামী ১৩ বছরে এর সাথে যোগ হবে আরো ১০০ কোটি। ২০১৭ সালের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বিশ্বের জনসংখ্যা হচ্ছে ৭৬০ কোটি। সংস্থাটির প্রক্ষেপণের চিত্রানুযায়ী এই শতাব্দীর শেষেই বিশ্বের বহু জনবহুল অঞ্চল মানুষের অভাবে বিরাণভূমিতে পরিণত হবে। এর কারণ সেসব দেশের দ্রুত জনসংখ্যা হ্রাস। অনেক দেশে প্রতি দুজন মৃতের বদলে জন্ম নিচ্ছে একজন মানুষ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ক্রমাগতভাবে মানুষ কমছে সারা দুনিয়ায় এমন দেশের সংখ্যা বর্তমানে ৫১টি। এর মধ্যে অনেক দেশে গত ৫০ থেকে ৬০ বছরে জনসংখ্যা বাড়েনি বরং কমেছে। জাতিসংঘের এই হিসাবে আরো বলা হয়েছে যে, ২০৫০ সালের মধ্যে অনেক দেশের জনসংখ্যা বর্তমানের তুলনায় এক তৃতীয়াংশে নেমে আসবে। এটা উবসড়মৎধঢ়যরপ ঃরসব নড়সন হিসাবে গণ্য হবে। এসব দেশে যদি অভিবাসী হিসেবে বিদেশীদের গ্রহণ করা না হয় এক সময় মানুষের অভাবে কোন কোন দেশ বিরাণভূমিতে পরিণত হতে পারে। অনেক সভ্যতা বিলুপ্ত হতে পারে। রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, গত কয়েক দশক ধরে জন্ম হার না বাড়ার কারণে বুলগেরিয়া, স্পেন, জাপান এবং ইউরোপের প্রায় সব দেশের অনেক গ্রাম ও লোকালয় উজাড় হয়ে গেছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেছে। বুলগেরিয়ার কোন কোন পাড়া ও গ্রামে মাত্র ৩০ জন লোক পাওয়া গেছে, এক সময়ে যেসব স্থান মানুষের কোলাহলে পূর্ণ ছিল। দেশটিতে প্রতি হাজারে মারা যায় ১৬ জন, জন্ম নেয় ৯ জন। পর্তুগালে ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত মারা গেছে ৫২,৩৬৩ জন এবং জন্ম নিয়েছে ৩৪,৪৮৩ জন। ইতালিতে একই সময়ে মারা গেছে ১,৮৫,০০০ মানুষ, জন্ম নিয়েছে ১,০৮,০০০ শিশু। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে যে, ১৯৭০ সালে বিশ্বে একজন নারীর গড়ে ৪.৫ জন সন্তান ছিল; ২০১৫ সালে এই সংখ্যা ২.৫ জনে হ্রাস পেয়েছে (ঋবৎঃরষরঃু ৎধঃব)। জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য জন্মহার প্রয়োজন ২.১ জন। ইউরোপে এই হার হচ্ছে গড়ে ১.৫৫ জন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রেও তাই। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা দ্রুত জনসংখ্যা কমছে এমন দশটি শীর্ষ দেশের তালিকা তৈরি করেছে। এসব দেশে একজন নারীর সন্তান সংখ্যা ১.৩ জন, স্পেনে ১.২ জন। জার্মানির মতো অনেক দেশে ৫০/৬০ বছর ধরে অব্যাহতভাবে স্থানীয় জনসংখ্যা কমলেও তারা তাদের জনসংখ্যা অভিবাসনের মাধ্যমে স্থিতিশীল রেখেছে। এসব দেশে দীর্ঘকাল জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। মানুষকে ভোগ বিলাসের দিকে ঠেলে দিয়ে সন্তান ধারণ ও পালনের প্রতি বিতৃষ্ণ করে দেয়া হয়েছে। ফলে এখন জনসংখ্যা বৃদ্ধির শত চেষ্টা করেও তারা সফল হতে পারছে না। অর্ধশতাধিক দেশ এই চেষ্টা করছে। মানুষের অভাবে শিল্পের চাকা ঘুরছে না। অর্থনীতিতে ধস নামছে। শিল্প ও সেবা খাত বিদেশীদের হাতে চলে যাচ্ছে। এই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০৫০ পর্যন্ত যেসব দেশের জনসংখ্যা বেশি হ্রাস পাবে সেসব দেশ হচ্ছে বুলগেরিয়া, লাটভিয়া, লিথুনিয়া, পোল্যান্ড, মলডোবা, রুমানিয়া, সার্বিয়া, ইউক্রেন, হাঙ্গেরী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া দ্বীপপুঞ্জ। দ্রুত জনসংখ্যা এমন এশীয় দেশগুলোর মধ্যে জাপান প্রধান। এর পরে জর্জিয়া, পর্তুগাল, বসনিয়া, হার্জেগোবিনা এবং বেলারুশ। নি¤œ জন্মহার বিশিষ্ট জনবহুল দেশসমূহ হচ্ছে, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, রাশিয়া, জাপান, ভিয়েতনাম, এস্তোনিয়া, লেবানন, গ্রীস, দক্ষিণ কোরিয়া, আলবেনিয়া ও বেলারুশ প্রভৃতি।
নগরায়ন, শিল্পায়ন, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে নারীর অগ্রযাত্রা, ক্যারিয়ার, শিশু লালন পালন ও শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি, কাজের সন্ধানে দেশ ত্যাগ, ভোগবাদিতা, জীবনযাত্রা কঠিন থেকে কঠিন হওয়া প্রভৃতি কারণে ইউরোপ আমেরিকাসহ উন্নত দেশের বহু নারী সন্তান গ্রহণে অনিচ্ছুক, অনেকে বিয়ে করতে রাজি নয় এসব কারণে জনসংখ্যা কমছে।
তথাকথিত উন্নত দেশগুলোতে এখন ভোগবাদিতা এত চরমে উঠেছে যে, তার বেদিতে পারিবারিক শৃঙ্খলা এমনকি পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে খান খান হয়ে যাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক সম্পাদিত একটি গবেষণা সমীক্ষা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ৫৪ ভাগ নারী তাদের স্বামীদের তুলনায় কুকুরকে বেশি ভালোবাসে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স প্রভৃতিসহ উন্নত দেশসমূহে এখন পরিবার নিশ্চিহ্ন হবার পথে। বিয়ের স্থান দখল করছে লিভটুগেদার, জারজ সন্তান এত বেশি হয়ে গেছে যে, কোনটি জারজ নয় অনেক দেশে তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। উবঢ়ড়ঢ়ঁষধঃরড়হ, জনসংখ্যা হ্রাস অথবা মানুষের অভাবে দেশের পর দেশ বিরাণভূমিতে পরিণত হবার যে আশঙ্কা ও বাস্তবতা জাতিসংঘের রিপোর্টে উঠে আসছে তাকে আল্লাহর একটি গজব বলে সহজেই চিহ্নিত করা যায়। এই গজব শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর মাঝামাঝি সময় থেকে। মালথাসের পপুলেশন থিওরি বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
৬০ এর দশকের শুরুতে জনসংখ্যাকে দায় এবং উন্নয়নের প্রধান প্রতিবন্ধক হিসেবে গণ্য করার মাত্রা চরমে উঠেছিল। তখন এই ধারণার সমর্থনে ম্যালথাসের জনসংখ্যা তত্ত্বকে প্রধান ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হতো। বলা হতো যে, উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি ঘটে গাণিতিক হারে এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় জ্যামিতিক হারে। ফলে দেশে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন মানুষের ভোগ-বিলাসের যে সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে তা এতই সীমিত হয়ে যায় যে, ক্রমবর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার জন্য তা খুব একটা অবশিষ্ট থাকে না। অভাব-অনটন, দারিদ্র্য মানুষের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায় এবং রাষ্ট্র তার নাগরিকদের বাঞ্ছিত সুযোগ-সুবিধা ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। এর একমাত্র সমাধান হচ্ছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ দুনিয়ার সব ধনী দেশগুলোই জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এসব দেশের বড় বড় শিল্পপতি-ব্যবসায়ীরা লক্ষ-কোটি ডলার বিনিয়োগ করে জনসংখ্যা বিধ্বংসী উপকরণ  সামগ্রী ও সাহিত্যভা-ার সৃষ্টি করে তৈরি করে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে দুনিয়াতে বিতরণ করতে থাকে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রি মানুষের লজ্জা-শরম তুলে দেয় এবং ব্যভিচারের প্রসার ঘটায়। বিনোদনের নামে অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর পথ ধরে আসে পর্নোগ্রাফি। এখন সামাজিক এমন কোনো মাধ্যম নেই যেখানে মানুষের চরিত্র ধ্বংসের উপকরণ নেই।
ষাটের দশকের শুরুতে আমাদের দেশে স্বৈরতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে মুসলিম বিশ্বসহ আমাদের দেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। এই দেশের আলেম সমাজ এর বিরুদ্ধে একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিল। এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে ফিলিপাইন এই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেনি। ঐ দেশের ক্যাথলিক পাদ্রীরা সম্মিলিতভাবে এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিলেন।
খ্যাতনামা আলেমে দ্বীন ও ইসলামী আন্দোলনের নেতা পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন আমীর মাওলানা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী তার রচিত ‘ইসলাম আওর জবতে বেলাদত’ ইসলামের দৃষ্টিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পুস্তকে এর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ কলিন ক্লার্কসহ পাশ্চাত্যের অসংখ্য বিশেষজ্ঞের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন যে, জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে জনসংকট ও মেধা সংকটের সৃষ্টি হবে এবং রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়বে। ইসলামের দৃষ্টিতে চরম স্বাস্থ্যগত কারণ ছাড়া জন্ম নিয়ন্ত্রণ নিষিদ্ধ। তাকে তখন মোল্লা বলা হয়েছিল এবং তার পুস্তকটি পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই যে, তার পুস্তকটি লেখার চার দশক পার না হতেই তার ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ ফলতে শুরু হয়েছিল। জনসংখ্যা হ্রাসের ফলে প্রথমত বেশ কিছু দেশ উপলব্ধি করতে শুরু করল যে, তাদের দেশে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে তাদের বয়স্ক সুবিধা প্রদানের জন্য যে অর্থোপার্জন প্রয়োজন তা করার জন্য যে যুব জনশক্তির দরকার তা নেই। তাদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে লোকের অভাবে দেশই বিরাণ হয়ে যাচ্ছে। অনেক দেশ অভিবাসনের মাধ্যমে ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করছে। এর বিরুদ্ধে আবার স্থানীয়রা সন্ত্রাসী হয়ে উঠছে। এই অভিবাসীদের মধ্যে সবাই যে মুসলমান তা নয়। আবার মুসলিম নামধারী অভিবাসীরা সবাই যে ইসলাম প্রচারের জন্য অভিবাসী হয়েছেন তাও নয়, অনেকে গেছেন ভাগ্যের অন্বেষণে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর সামনে অভিবাসী না নিয়ে সমস্যা সমাধানের বিকল্প কোনো সমাধান নেই। এখন এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকভাবে করণীয় কিছু আছে কিনা সেটাই হচ্ছে প্রশ্ন। আমার মনে হয় অনেক কিছুই করার আছে। সমস্যা চিহ্নিত হয়ে গেছে। সমাধানও আপাতত অভিবাসন। নিউজিল্যান্ডে মসজিদে হামলাকারী হামলাপূর্ব তার বিবৃতিতে নিজেকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনুসারী বলে দাবি করেছে। মুসলিম বিদ্বেষটি সে জাতিগতভাবেই ইহুদি-খ্রিস্টানদের কাছ থেকেই পেয়েছে। বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী শুরু থেকেই পরিচিতি লাভ করেছেন এবং সে সূত্রে সম্ভবত হামলাকারী তাকে স্বগোত্রীয় বলে ধারণ াকরে থাকবেন। মুসলমানদের টার্গেট করা তার অন্যতম যুক্তি হচ্ছে অভিবাসন। ইউরোপ অভিবাসনের কারণে তাদের হাত ছাড়া হয়ে যাচ্ছে এবং মুসলিম অভিবাসীরা তা দখল করে নিচ্ছে। এই উৎকণ্ঠা স্বাভাবিক। এর জবাব সন্ত্রাস নয়, ফিতরাতে প্রত্যাবর্তন। ইউরোপকে মুসলমানরা পথ দেখিয়েছে, সভ্যতা শিখিয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামকে জানার সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার। ইসলামী ব্যবস্থার সৌন্দর্য সম্পর্কে যদি পথভ্রষ্ট নির্বিশেষে সকল মানুষকে অবহিত করা যায় তাহলে অবস্থার পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। অভিবাসন প্রক্রিয়ায় যদি ইসলামী আন্দোলন ও সংগঠনগুলো অংশ নেয় এবং দাওয়া ও তরবিয়া মিশন হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদের চরিত্রমাধুর্য দেখে মানুষ তাদের প্রতি আকৃষ্ট হবে। অভিবাসন কেন প্রয়োজন হলো? ইসলামী পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থায় ফিরে আসলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যাবে।
ইসলাম সন্ত্রাসের ধর্ম নয়। মুসলমানদের উপর সন্ত্রাসী হামলার জবাব সন্ত্রাস নয়, বরং ধৈর্য্য ও সহনশীলতার মাধ্যমেই দিতে হবে। মসজিদে হামলায় নিহত সকল ভাইবোনের আত্মার আমরা মাগফেরাত কামনা করি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি আমারা সমবেদনা জানাই।
লেখক ড. মো. নূরুল আমিন 
সৌজন্যে : দৈনিক সংগ্রাম