Articles by "খেলোয়ারদের জীবনী"
Showing posts with label খেলোয়ারদের জীবনী. Show all posts

খুব অল্প পরিসরে পেলের সম্পর্কে বলাটা আসলে খুব কঠিন কাজ। তবুও কিছুটা বলার চেষ্টা করি। পেলে পরবর্তী যুগে পেলেকে ছাড়ানো সম্ভব এমন খেলোয়াড় এসেছিলেন মাত্র ৪ জন- দিয়েগো ম্যারাডোনা, রোনালদো লিমা, রোনালদিনহো আর লিওনেল মেসি। অনেকে জিনেদিন জিদান বা ইয়োহান ক্রুয়েফের নাম আনবেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের কোনো পর্যায়েই এই দুজন সম্পর্কে বলা হয়নি যে, তারা পেলেকে ছাড়িয়ে গিয়েছেন কিংবা ছাড়াতে পারবেন। এর কারণ হচ্ছে, পেলেকে ছাড়ানোর জন্য অনেক ছোট বয়স থেকে ভালো খেলাটা জরুরী এবং ক্যারিয়ার শেষেও ভালো ফর্ম বজায় রাখতে হবে। এই কাজটা সবচেয়ে ভালোভাবে শুরু করতে পেরেছিলেন ম্যারাডোনা, রোনালদো, রোনালদিনহো আর মেসিই।



রোনালদো পিছিয়ে গিয়েছিলেন ইনজুরির জন্য, আর রোনালদিনহো হারিয়ে গিয়েছিলেন ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস না থাকার কারণে। মেসি এখনো দৌড়ে আছেন, কিন্তু মনে হচ্ছে না পেলেকে ছাড়াতে পারবেন। কারণ পেলের ক্যারিয়ারে বড় ধরনের কোনো ব্যর্থতা নেই; সফলতার জন্য যেমন নম্বর যোগ হয়, ব্যর্থতার জন্য তেমনই নাম্বার কাটা যায়। ক্যারিয়ারের এই পর্যায় পর্যন্ত দুর্দান্ত সফলতার সাথে সাথে মেসির কিছু ব্যর্থতাও আছে। তবুও কারো ক্যারিয়ার শেষের আগে বিচার না করে একটু অপেক্ষা করাই ভালো।

এই চারজনের মাঝে ম্যারাডোনাই পেলের আসনে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা দিয়েছিলেন। আমি ম্যারাডোনার খেলা দেখেছি, মনে হয়েছে, এর চেয়ে ভালো খেলা আর কীভাবে সম্ভব? পেলের খেলা দেখিনি, তবে পেলে যদি ম্যারাডোনার চেয়েও ভালো খেলে থাকে, তাহলে আমাকে বলতেই হবে ‘ওয়াও’। একই সাথে বিচার করার সময় আবেগ সরিয়ে সবাইকে বাস্তববাদীও হতে হবে। পেলে সর্বশেষ বিশ্বকাপ খেলেছেন ১৯৭০ সালে, এতদিন পরেও বিশেষজ্ঞদের যেকোনো তালিকায় প্রথম নামটা পেলেরই থাকে। ২য় থেকে ১০ম ক্রমে অনেক নাম পরিবর্তন হয়। পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অনেক যুক্তিই দেখানো যাবে, কিন্তু এক নম্বরটা অপরিবর্তিতই রয়ে গিয়েছে। বেশির ভাগ ফুটবল বিশেষজ্ঞের মতেই সবার চেয়ে অনেক খানি এগিয়ে থাকেন পেলে। ২০০০ সালে IFFHS (International Federation of Football History & Statistics) এর তত্ত্বাবধানে সাবেক খেলোয়াড় আর সাংবাদিকদের ভোটে শতাব্দীর সেরা খেলোয়াড় নির্বাচন করা হয়। তাতে ১৭০৫ ভোট পেয়ে পেলে প্রথম হন, দ্বিতীয় স্থানে থাকা ক্রুয়েফ পান ১৩০৩ ভোট।

‘কালো মানিক’ খ্যাত ব্রাজিলের পেলেকে বলা হয় ফুটবলের সম্রাট। পেলে খেলেছেন এমন কোনো টুর্নামেন্টের সর্বকালের সেরা একাদশ থেকে মনে হয় তাকে বাদ দেয়া যাবে না। শুধু ফুটবলারই নন, জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করে জয়ী এক যোদ্ধার নাম পেলে। চলুন, শোনা যাক সেই জীবনের কিছু কথা। 

ব্রাজিলের ত্রেস কোরাকোয়েস শহরের এক বস্তিতে জন্ম পেলের, সঠিকভাবে বললে ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর। দরিদ্র পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে অভাব অনটন মেটানোর জন্য ছেলেবেলাতেই পেলেকে চায়ের দোকানে কাজ করতে হয়। এর সাথে রেলস্টেশনে ঝাড়ু দেবার পাশাপাশি কিছুদিন জুতা পরিষ্কার করার কাজও করেছিলেন। পেলের পুরো নাম ‘এডসন অ্যারানটিস দো নাসিমেন্তো’। নামটা রাখা হয়েছিল বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী টমাস আলভা এডিসনের নামের সাথে মিল রেখে।

ফুটবলে সহজাত প্রতিভা ছিল তার। ফুটবল কেনার টাকা ছিল না বিধায় মোজার ভেতরে কাগজ ঠেসে বানানো ফুটবলে চালাতেন অনুশীলন। ব্রাজিলের অন্যান্য খেলোয়াড়ের মতোই গলির ফুটবলে পেলের প্রতিভা ফুটে উঠে। কিন্তু উপরওয়ালার দয়াতেই হয়তো মাত্র ১৫ বছরের পেলের উপর নজর পড়ে সান্তোসের গ্রেট ওয়ালডেমার ডি ব্রিটোর। তা না হলে হয়তো তার প্রতিভা গলিতেই সীমাবদ্ধ থাকতো। ব্রিটো পেলেকে গলি থেকে নিয়ে যান সান্তোস ক্লাবে এবং সান্তোসের ‘বি’ টিমে তাকে সুযোগ দেন। এখানেও সহজাত প্রতিভা দেখিয়ে এক বছরের মাঝে সান্তোসের মূল দলে নিজের জায়গা করে নেন তিনি। 

পেলে যখন সান্তোসের মূল দলে যোগ দেন, তখন তার বয়স ১৬ বছর। সেবার ব্রাজিলের পেশাদার ফুটবল লীগে সান্তোসের হয়ে লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারটি অর্জন করেন তিনি। সেবারের ব্রাজিলিয়ান লীগে পেলের পারফরম্যান্স এতটাই নজরকাড়া ছিলো যে, তা স্বয়ং ব্রাজিল সরকারেরও চোখ এড়ায়নি। পেলের এই পারফর্মেন্স তাদের কাছে অমূল্য হিসেবে বিবেচিত হলো। তাই আইন করে পেলেকে ব্রাজিলের জাতীয় সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল! রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনার মতো জায়ান্টরা তাকে দলে নিতে চাইলেও সরকারের অনুরোধে ইউরোপিয়ান লীগে পেলের কোনো দিন খেলা হয়নি। 

পেলের প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য ‘পেলে ল’ নামে একটি আইন ব্রাজিলে কার্যকর হয়েছে ২০০১ সালে ব্রাজিল ফুটবলে দুর্নীতির বিচারের জন্য! 

অসাধারণ ব্যক্তি হিসেবেও পেলের যথেষ্ট সুনাম রয়েছে। তখন ইউরোপে খেললে স্বাভাবিকভাবেই অনেক টাকা আয় করা যেত, কিন্তু সরকারের অনুরোধে দেশের স্বার্থে সেটা হাসিমুখে ছেড়ে দিয়েছেন তিনি। পেলে ভুলে যাননি তার নিজের দারিদ্র্যে ভরা শৈশবকেও, ব্রাজিলের দরিদ্র শিশুদের সাহায্য করতে খেলোয়াড়ি জীবনেই গড়েছেন বিশেষ ফাউন্ডেশন। আর খেলা ছাড়ার পর কখনো ইউনিসেফের বিশেষ দূত, কখনো জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক বিশেষ দূত, কখনো বা ব্রাজিলের ‘বিশেষ’ ক্রীড়ামন্ত্রী হিসেবে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছেন তাদের সাহায্য করতে। 

বৈশ্বিক কর্মকান্ডেও পেলের কিছু খ্যাতি আছে। একবার পেলে নাইজেরিয়ায় গিয়েছিলেন। সে সময় নাইজেরিয়ায় গৃহযুদ্ধ চলছিলো। শুধুমাত্র পেলেকে দেখার জন্য নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধে বিবদমান দলগুলো ৪৮ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছিল! 

রুপালী পর্দাতেও পেলেকে দেখা গিয়েছে। ১৯৬৯ সালে ব্রাজিলিয়ান টেলিভিশনের ধারাবাহিক ওস এস্ত্রানহোতে প্রথম দেখা গিয়েছিল কালো মানিককে। হলিউডের ছবি এসকেপ টু ভিক্টোরিতে মাইকেল কেইন, সিলভেস্টার স্ট্যালোনদের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক যুদ্ধবন্দীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন পেলে। ১৯৯৯ সালে টাইম ম্যাগাজিনে বিংশ শতাব্দীর ১০০ জন মানুষের তালিকায় জায়গা পান পেলে। 

এসব তো গেল খেলোয়াড় পেলের বাইরের কিছু কীর্তি, এবার খেলার ভেতরের কিছু কীর্তির কথা শোনা যাক। 

আন্তর্জাতিক ফুটবলে পেলে

ব্রাজিলের হয়ে পেলের আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ার শুরু হয় চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনার বিপক্ষে। সময়টা ছিল ১৯৫৭ সালের ৭ জুলাই। সেই ম্যাচে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার কাছে ২-১ গোলের ব্যবধানে হেরে গেলেও প্রথম ম্যাচেই বিশ্বরেকর্ডটি করতে ভুল করেননি পেলে। ১৬ বছর ৯ মাস বয়সে গোল করে তিনি অর্জন করেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার রেকর্ড। পুরো ক্যারিয়ারে সর্বোচ্চ ৯২টি হ্যাট্রিক, ব্রাজিলের সর্বোচ্চ গোলদাতা (৭৭ গোল), ক্যারিয়ারে ১৩৬৩ ম্যাচে ১২৮৩ গোল- এই পরিসংখ্যানগুলো তার অর্জনের খুব সামান্যটুকুই বোঝাতে পেরেছে। 

পেলের যুগে ইউরোপিয়ান নন এমন খেলোয়াড়দেরকে ‘ব্যালন ডি অর’ সম্মাননা দেয়ার নিয়ম ছিল না। ২০১৬ সালে ব্যালন ডি অর এর ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ১৯৯৫ সালের আগ পর্যন্ত ইউরোপিয়ান নন এমন খেলোয়াড়দেরকেও বিবেচনায় এনে নতুন করে একটি তালিকা প্রকাশ করা হয় । এখানে পূর্ববর্তী ৩৯টি ব্যালন ডি অর-এ ১২টি পরিবর্তন হয়। ১৯৫৮, ১৯৫৯, ১৯৬০, ১৯৬১, ১৯৬৩, ১৯৬৪ আর ১৯৭০ এর ব্যালন ডি অর জয়ী ঘোষণা করা হয় পেলেকে। তবে সম্মানের জন্য আগের খেলোয়াড়দের নামও রাখা হয়। 

তিনটি বিশ্বকাপ জেতা একমাত্র খেলোয়াড় পেলে, এই একটি কথাই তার অর্জনকে অনেক উপরে তুলে দেয়। ১৯৩০ সাল থেকে শুরু হওয়া প্রতিটি বিশ্বকাপেই ফেভারিট হিসেবে যাত্রা করে ব্রাজিল। কিন্তু পেলে আসার আগে ২৮ বছর বিশ্বকাপ জিততে পারেনি তারা। পেলে যাওয়ার পরেও পরবর্তী বিশ্বকাপ জেতে ২৪ বছর পরে। আপনি যখন জানবেন, চারটি বিশ্বকাপে ১৪টি ম্যাচ খেলে ১২টি গোল আর ১০টি অ্যাসিস্ট, দুটি ফাইনালে গোল করার রেকর্ড, চারটি ভিন্ন ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করার রেকর্ড- তাহলে পেলে সম্পর্কে আপনার শ্রদ্ধাবোধ আরেকটু বাড়ার কথা। বিশ্বকাপে পেলের অবদানগুলো একনজরে দেখা যাক। 

১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপ
মাত্র ১৭ বছর বয়সে ব্রাজিলের মতো দলের হয়ে বিশ্বকাপ খেলা যেনতেন বিষয় নয়। সেই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্যায়ে একটি অ্যাসিস্ট দিয়ে শুরু করেন। কোয়ার্টারে ওয়েলসের বিরুদ্ধে পেলের একমাত্র গোলে ব্রাজিল সেমিফাইনালে পৌঁছে। এই গোল করে বিশ্বকাপে সর্বকনিষ্ঠ (১৭ বছর ২৩৯ দিন) গোলদাতা হিসেবে রেকর্ডবুকে নাম লেখান পেলে। এরপর সেমিফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকাপের সর্বকনিষ্ঠ (১৭ বছর ২৪৪ দিন) হ্যাটট্রিকদাতার রেকর্ড করেন। ফাইনালেও দুই গোল করেন । সেই বিশ্বকাপের সিলভার বল ও সিলভার বুট দুটোই জেতেন পেলে। এছাড়া সেই বিশ্বকাপের সেরা উদীয়মান তারকার পুরষ্কারও জেতেন তিনি। 

১৭ বছর বয়সে বিশ্বকাপ জেতাটা কী, সেটা বোঝানোর জন্য আরো কিছু গ্রেটের পরিসংখ্যান উল্লেখ করা জরুরী মনে করছি। 

ম্যারাডোনা ২২ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন।

রোনালদো ১৮ বছর বয়সে বিশ্বকাপ একাদশে সুযোগ পান। কিন্তু রোমারিও, বেবেতোর ভিড়ে মূল একাদশে জায়গা পাননি।
জিদান ফ্রান্সের মূল দলেই সুযোগ পান ২২ বছর বয়সে, আর বিশ্বকাপ একাদশে সুযোগ পান ২৬ বছর বয়সে।
মেসি ১৯ বছর বয়সে বিশ্বকাপ একাদশে সুযোগ পান। কিন্তু সবগুলো ম্যাচে খেলার সুযোগ পাননি।
ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ২১ বছর বয়সে প্রথম বিশ্বকাপ খেলেন।
উপরে উল্লেখিত সব খেলোয়াড়ই লিজেন্ড। তাদের কাউকে ছোট করার জন্য তথ্যগুলো দেয়া হয়নি। কিন্তু ১৭ বছর বয়সে তখনকার ব্রাজিল দলে সুযোগ পাওয়াটা যে একটা বিশেষ ব্যাপার, সেটা বোঝানোর জন্যই এর অবতারণা করা হয়েছে। আর পেলে সেই সুযোগটা কাজেও লাগিয়েছেন দারুণভাবে। 

১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ
এই বিশ্বকাপে পেলে তৎকালীন সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি নিয়ে খেলা শুরু করেন এবং আশা করা হচ্ছিল এটা পেলের টুর্নামেন্ট হবে। চিলির বিরুদ্ধে প্রথম গোলে অ্যাসিস্ট করে আর চারজন ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করে দ্বিতীয় গোল দিয়ে সেই পথেই ছিলেন তিনি। কিন্তু চেকোস্লোভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচে ইনজুরিতে পড়ে বাকি টুর্নামেন্ট মিস করেন। 

১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপের ব্রাজিলের দলকে ধরা হয় তৎকালীন ব্রাজিলের সেরা দল। গ্যারিঞ্চা, গিলমার, সান্তোস, জোয়ারজিনহো, টোস্টাও, গারসেন, আর সাথে পেলে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে মাত্র তিনটি ম্যাচ খেলে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ব্রাজিল। প্রথম ম্যাচে বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে পেলে গোল করেন, কিন্তু বুলগেরিয়ান ডিফেন্ডারদের বর্বরোচিত ফাউলে ইনজুরিতে পড়ে পরের ম্যাচ মিস করেন। হাঙ্গেরীর বিরুদ্ধে সেই ম্যাচে হেরে যায় ব্রাজিল। কোচ ভিসেন্তে ফিওলা গ্রুপের শেষ খেলায় ইউসেবিওর পর্তুগালের বিপক্ষে যখন পেলেকে নামান, তখন সবাই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যায়। কারণ তখনও পেলে তার ইনজুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সেই ম্যাচটাকে ‘৬৬ এর বিশ্বকাপের সবচেয়ে বাজে ম্যাচ বলে স্বীকার করা হয়। ওই ম্যাচে পুরো ব্রাজিল দল, বিশেষত পেলেকে এত বেশি পরিমাণ ফাউল করা হয় যে, পেলে মাঠ থেকে তো ইনজুরড হয়ে বের হনই, সেই সাথে ম্যাচের পর তিনি অবসরের ঘোষণাও দেন। পরবর্তীতে ইউসেবিও এবং পর্তুগালের সমস্ত টিম মেম্বার অফিসিয়ালি ব্রাজিলের কাছে ক্ষমা চায়।

১৯৭০ এর বিশ্বকাপ
১৯৭০ এর বিশ্বকাপে পেলের খেলার কথা ছিল না। কিন্তু ১৯৬৯ এর শুরুতে পেলেকে আবার দলে নেয়া হয় এবং বাছাইপর্বে তিনি ৬ ম্যাচে অংশ নিয়ে ৬টি গোল করেন। এই টুর্নামেন্টে পেলে মূলত প্লে-মেকার হিসেবে খেলেন। ফাইনাল ম্যাচে ইতালির বিরুদ্ধে প্রথম গোলটি সহ পুরো টুর্নামেন্টে ৪টি গোল আর ৭টি অ্যাসিস্ট করে সেই বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার জিতে নেন তিনি। সাথে বিশ্বকাপ জিতে জুলেরিমে কাপটাকে চিরতরে নিজেদের করে নেন। এখানে একটা বিষয় লক্ষ্য করলে বুঝতে পারবেন, ফুটবলে প্রজন্ম একটা বড় বিষয়। এক প্রজন্ম সচরাচর দুটি বিশ্বকাপ ভালো খেলে। কিন্তু পেলে চারটি বিশ্বকাপেই তার যাদু দেখিয়েছেন। সবচেয়ে বড় কথা- বিভিন্ন প্রজন্মের সাথে সুন্দরভাবে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন। প্রতিটি বিশ্বকাপের শেষে একটি অল ষ্টার দল ঘোষণা করা হয়। পেলে ১২ বছরের ব্যবধানে দুটি দলে (১৮৫৮ ও ১৯৭০) জায়গা পান। এত সময়ের ব্যবধানে এরকম কোনো দলে আর কোনো খেলোয়াড় সুযোগ পাননি। 

কোপা আমেরিকা
১৯৫৯ সালে আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকার ফরম্যাট ছিল লীগ ভিত্তিক। ৭টি দেশের টুর্নামেন্টে শেষ ম্যাচে সমীকরণটা ছিল এমন যে, টুর্নামেন্ট জিততে হলে ব্রাজিলকে ম্যাচ জিততে হবে, আর আর্জেন্টিনার কেবল ড্র হলেই চলবে। ১-১ গোলে ড্র হওয়া সেই ম্যাচে ব্রাজিলের পক্ষে গোল করা পেলে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করতে না পারলেও পুরো টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ৮ গোল করেন এবং টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার জিতে নেন। 

ক্লাব ফুটবলার পেলে
ক্লাব ফুটবলেও পেলে অসাধারণ ছিলেন। দলগতভাবে ক্লাবের হয়ে শিরোপা জিতেছেন ২৬টি। ঘরোয়া লীগে ১১ বার সর্বোচ্চ স্কোরার হওয়ার কৃতিত্ব তার অর্জনের সামান্যটুকুই বোঝাতে সক্ষম। 

পেলের সম্পর্কে অনেকের একটা অভিযোগ আছে যে, তিনি ইউরোপীয় ফুটবলে কখনো খেলেননি, যা কিনা তার জন্য একটা সীমাবদ্ধতা। তিনি ইউরোপে খেলেন নি, কিন্তু ইউরোপে তার পারফর্মেন্স বিস্ময় জাগানোর জন্য যথেষ্ট। জাতীয় দল ছাড়াও ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপে তো তার পারফর্মেন্স মুগ্ধ করার মতো। তবে এগুলো ছাড়াও পেলের আরো কিছু ম্যাচ আছে ইউরোপিয়ান দলগুলোর বিপক্ষে। এসব দলের বিপক্ষে ১৩০ ম্যাচ খেলে পেলের গোল ১৪২ টি। 

ক্লাবের হয়ে দুটি মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টে পেলের কিছু অবদান তুলে ধরা যাক। 

কোপা লিবার্তোদোরেস
ইউরোপের জন্য যেমন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ, ল্যাটিনের তেমনই কোপা লিবার্তোদোরেস। ১৯৬০ সাল থেকে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টে সান্তোস শিরোপা জেতে ১৯৬২ আর ১৯৬৩ সালে। পেলে পরবর্তী যুগে শিরোপা পেতে আবার সময় লাগে ৫৮ বছর। পরবর্তী শিরোপা তারা পায় ২০১১ সালে। 

১৯৬২ সালের টুর্নামেন্টে সান্তোস গ্রুপ পর্ব ভালোভাবেই পার করে। গ্রুপের একটা ম্যাচে পেলে দুই গোলও করেন। এরপর ফাইনালে তারা মুখোমুখি হয় উরুগুয়ের অন্যতম সফল ক্লাব পেনারোলের। দুই লেগ মিলিয়ে খেলা ড্র হওয়ায় প্লে অফ ম্যাচ হয়। সেই ম্যাচে পেলের দুই গোলে ম্যাচ জিতে প্রথমবারের মতো টুর্নামেন্ট জিতে নেয় সান্তোস। 

১৯৬৩ সালের টুর্নামেন্টে সাবেক চ্যাম্পিয়ন হিসেবে সান্তোস সরাসরি সেমিফাইনাল পর্বে খেলে। সেখানে তারা মুখোমুখি হয় গ্রুপ পর্বে চার ম্যাচে চারটিতেই জয় পেয়ে দুর্দান্ত খেলতে থাকা আরেক ব্রাজিলীয় ক্লাব বোটাফোগোর। দুই লেগের সেমিফাইনালের প্রথমটিতে ঘরের মাঠে ১-১ গোলে ড্র হওয়া ম্যাচে গোল করেন পেলে। এরপর অ্যাওয়ে ম্যাচে ৪-০ গোলে জেতা ম্যাচে হ্যাটট্রিক করেন তিনি। ফাইনালে সান্তোস মুখোমুখি হয় বোকা জুনিয়র্সের। সেখানে দ্বিতীয় লেগে জুনিয়র্সের মাঠে অ্যাওয়ে গোল করেন পেলে। 

ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ
ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ একসময় হতো শুধুমাত্র ইউরোপ জয়ী আর ল্যাটিন জয়ীদের মাঝে শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করার জন্য। পরবর্তীতে এটি ক্লাব ফুটবল নামে পরিচিত লাভ করে এবং এই টুর্নামেন্টে আরো কয়েকটি মহাদেশের চ্যাম্পিয়নরা অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। এই টুর্নামেন্টের মূল উদ্দেশ্য থাকে বছরের শ্রেষ্ঠ ক্লাব নির্বাচন করা।

সান্তোস এই টুর্নামেন্টটি জিতেছে দু’বার, দু’বারই পেলে থাকার সময়। শুধুমাত্র এই তথ্যটুকু পেলের গুরুত্ব পুরোপুরি বোঝাতে পারছে না। পুরোটা বুঝতে চাইলে একটু জানতে হবে। 

১৯৬২ সালে সান্তোসের প্রতিপক্ষ ছিল সেই সময়ের আরেক গ্রেট ইউসেবিওর বেনফিকা। চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শুরু হওয়ার পর সেটিতে একটানা পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়ে চ্যাম্পিয়ন্স লীগকে নিজের সম্পদ বানিয়ে ফেলা রিয়াল মাদ্রিদ ছিল ইউরোপের জায়ান্ট। ফাইনালে সেই জায়ান্ট বধ করে বেনফিকা ইউরোপের সর্বোচ্চ সাফল্য পায়। যদিও এর আগের বছরেই বেনফিকা ইউরোপে চ্যাম্পিয়ন হয়, কিন্তু রিয়ালের মুখোমুখি হতে হয়নি। ১৯৬২ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনালে রিয়াল ছিল দুই কিংবদন্তী স্টেফানো আর পুসকাস সহ। ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়েও সেই ম্যাচ ৫-৩ গোলে জিতে নেয় বেনফিকা। পুসকাসের হ্যাটট্রিকের জবাব দেন ইউসেবিও দুই গোল করে। যা-ই হোক, সে গল্প না হয় আরেকদিন শোনা যাবে। 

প্রথম লেগে ঘরের মাঠে সান্তোস মুখোমুখি হয় বেনফিকার। পেলের দুই গোলে ম্যাচটা জিতলেও (৩-২) দুইটি মূল্যবান অ্যাওয়ে গোল পেয়ে যায় বেনফিকা। নিজের মাঠে ১-০ গোলে জিতলেই চ্যাম্পিয়ন হতো বেনফিকা। কিন্তু পেলে হয়তো ভিন্নভাবে ভেবেছিলেন। ৫-২ গোলে জেতা ম্যাচটিতে হ্যাটট্রিক করে সান্তোসকে প্রথম ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ জেতান তিনি। 

১৯৬৩ সালে সান্তোসের প্রতিপক্ষ ছিল বেনফিকাকে হারিয়ে আসা এসি মিলান। এসি মিলানের মাঠে গিয়ে ৪-২ গোলে ম্যাচ হারলেও মূল্যবান ২টি অ্যাওয়ে গোল করেন পেলে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় লেগে সান্তোস ম্যাচ জিতলেও দুই লেগ মিলিয়ে খেলা ড্র হয়। প্লে অফে সান্তোস টুর্নামেন্ট জেতে। 

ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপের ইতিহাসে একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে হ্যাটট্রিক করার রেকর্ড পেলের। তবে নাম পরিবর্তন করে ক্লাব বিশ্বকাপ হওয়ার পর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ২০১৬ সালে হ্যাটট্রিক করেছেন। 

পেলে কোন পজিশনে খেলতেন?
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ কিংবা কোচদের সর্বকালের একাদশে তাকে মূলত স্ট্রাইকার হিসেবেই রাখা হয়। তবে পেলে দুর্দান্ত একজন প্লে-মেকারও ছিলেন। 

তবে সবচেয়ে মজার উত্তর দিয়েছিলেন কোচ সালদানা। তিনি ১৯৬৯-১৯৭০ সালে ব্রাজিলের জাতীয় দলের কোচ ছিলেন। ব্রাজিলের একজন সাংবাদিক তাকে প্রশ্ন করেছিলেন- তার স্কোয়াডের সবচেয়ে সেরা গোলকিপার কে? উত্তরে তিনি পেলের নাম নিয়েছিলেন। তার মতে, পেলে যে কোনো পজিশনেই খেলতে পারতেন। 

পশ্চিম জার্মানির গ্রেট বেকেনবাওয়ারের পেলেকে নিয়ে বলেছিলেন: 
“পেলে সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়। তিনি ২০ বছর সবার চেয়ে এগিয়ে থেকে ফুটবল বিশ্বে রাজত্ব করেছেন। দিয়েগো ম্যারাডোনা, ক্রুয়েফ, প্লাতিনির মতো খেলোয়াড়েরাও তার পেছনে থাকবে। পেলের সাথে তুলনা করার মতোও কেউ নেই।” 

ক্রুয়েফের মতে, “পেলে হচ্ছেন একমাত্র খেলোয়াড় যিনি যুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।” 
তবে পেলে সম্পর্কে সবচেয়ে মুগ্ধকর কথা বলেছেন হাঙ্গেরিয়ান লিজেন্ড ফেরেঙ্ক পুসকাস। তিনি বলেন, 
“সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হচ্ছেন আলফ্রেডো ডি স্টেফেনো। আমি পেলেকে এই তালিকার বাইরে রাখছি। কারণ তিনি এসবের উর্ধ্বে।”
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো- বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের কাছে ভালবাসার এক নাম। তাঁর পুরো নাম Cristiano Ronaldo dos Santos Aveiro। কীভাবে পর্তুগালের মাদেইরার সেই ছোট্ট শিশুটি আজকের বিশ্বখ্যাত ফুটবলার হলেন- সে গল্পটি কি সবার জানা আছে? চলো, জেনে নেওয়া যাক রোনালদোর ছেলেবেলার গল্প।


রোনালদোর জন্ম ১৯৮৫ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি, পর্তুগালের পশ্চিমে অবস্থিত মাদেইরা নামের ছোট্ট একটি দ্বীপে। শৈশব থেকেই তাঁর দারিদ্র্যের মাঝে বেড়ে ওঠা। চার ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট রোনালদো এক রুমে সবার সাথে গাদাগাদি করে থাকতেন। তার মা ছিলেন একজন রাঁধুনী, আর বাবা ছিলেন বাগানের মালী। স্কুলে রোনালদোকে তার সহপাঠীরা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতো কারণ তার বাবা স্কুলে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবেও মাঝেমধ্যে কাজ করতেন।

দারিদ্র্য-অপমানের দুঃখ ভুলতে শিশু রোনালদো বেছে নেন ফুটবলকে। হাতের কাছে একবার ফুটবল পেলে আর কিছু লাগতো না তাঁর, সব কষ্ট ভুলে যেতেন! এতোটাই খেলার পাগল ছিলেন, যে ঘুমানোর সময়ও ফুটবল জড়িয়ে ধরে ঘুমাতেন! পড়ালেখায় একদমই মন ছিল না তাঁর। মা পড়াশোনার কথা বললেই রোনালদোর ঝটপট উত্তর হতো, ‘আজকে স্কুলে কোন হোমওয়ার্ক দেয় নি তো!’ তাও জোর করে পড়তে বসালে, মা একটু চোখের আড়াল হলেই চুপিচুপি ফুটবল হাতে জানালা দিয়ে পালিয়ে বেরিয়ে পড়তেন রোনালদো!

মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি তাঁর এলাকা মাদেইরার একটি জনপ্রিয় ক্লাব ন্যাসিওনালে যোগ দেন। সেখানে দারুণ খেলে সবার নজরে পড়েন রোনালদো। ফলাফল স্বরূপ ১২ বছর বয়সে পর্তুগালের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ক্লাব স্পোর্টিং লিসবনে খেলার সুযোগ পান। কিন্তু একটি সমস্যা- তাঁকে পাড়ি জমাতে হবে পর্তুগালের রাজধানীতে। ছোট্ট রোনালদোকে প্রথমবারের মতো বাবা-মাকে ছেড়ে একা একা থাকতে হয় সেখানে। তাদের কথা মনে করে প্রতি রাতেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতেন তিনি

সেখানে স্কুলে বন্ধুদের মাঝে তিনি বেশ জনপ্রিয় হলেও পড়ালেখায় তাঁর একদমই মন ছিল না। স্কুলের এই গণ্ডিবদ্ধ জীবনে তাঁর মন টানতো না। তিনি জানতেন, অফিসে সারাদিন চাকরি করার জন্য তাঁর জন্ম হয়নি। তিনি এর চেয়ে অনেক বড় কিছু করবেন। তাই পড়ালেখার বদলে খেলাধুলাতেই বেশি মনোযোগী ছিলেন। মোটামুটি কেটে যাচ্ছিল সময়। কিন্তু স্কুলে এক শিক্ষক ছিলেন যিনি রোনালদোর কথার আঞ্চলিক টান নিয়ে তাচ্ছিল্য করতেন। অন্য ছাত্ররা হলে মুখ বুজে সয়ে যেতো, কিন্তু রোনালদোর তো বয়ে যায়নি স্কুলের কর্তৃপক্ষের ভয় করতে, তিনি এর থোড়াই কেয়ার করেন। একদিন কথায় কথায় সেই শিক্ষক আবার তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করলে ১৪ বছর বয়সী রোনালদো রেগে চেয়ার তুলে ছুঁড়ে মারেন সেই শিক্ষকের উপর। স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয় কিশোর রোনালদোকে। তারপর তিনি আর পড়ালেখার ধার ধারেননি।

যাক, পড়ালেখার আপদ আর নেই! ইচ্ছামতো মনের খুশিতে ফুটবল খেলে ভালোই যাচ্ছিল সময়। কিন্তু ১৫ বছর বয়সে এক কঠিন পরীক্ষায় পড়লেন রোনালদো। ডাক্তারি পরীক্ষায় তার একটি অসুখ ধরা পড়লো, ‘Racing Heart disease’ যার মানে হচ্ছে রোনালদোর হার্টবিট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি থাকে। খেলাধুলা করার সময় এমনিতেই মানুষের হার্টবিট বেড়ে যায়, আর এমন অসুখ থাকলে তো খেলার কথা কল্পনাই করা যায়না! ডাক্তাররা সাফ জানিয়ে দিলেন রোনালদোর আর ফুটবল খেলা চলবে না। কারণ এর আগেও অনেক ফুটবলার এই অসুখে ভুগে খেলার মাঠে হৃদপিণ্ড বিকল হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন!

কিন্তু ফুটবল ছাড়া রোনালদো বাঁচবেন কী নিয়ে? কল্পনা করে দেখো, রোনালদো ফুটবলার হওয়ার বদলে অফিসে ডেস্কে বসে নয়টা-পাঁচটা চাকরি করছেন! এমন জীবন বেছে নেওয়ার চেয়ে মৃত্যুই যেন ভাল। তাই রোনালদো কঠিন একটি সিদ্ধান্ত নিলেন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেজার সার্জারি অপারেশন করালেন। এবং স্রষ্টার অশেষ কৃপায় সুস্থও হয়ে গেলেন! ডাক্তারদের নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে কয়েক মাসের মধ্যেই খেলার মাঠে ফিরে এলেন রোনালদো!

এরপর তাঁকে আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। ২০০৩ সালে মাত্র আঠার বছর বয়সে তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে চুক্তি করেন ১২ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে। তিনি ক্লাবটির ইতিহাসে প্রথম পর্তুগিজ খেলোয়াড় ছিলেন। সেখানে তিনি দারুণ কৃতিত্বের সাথে ভূমিকা রাখেন ক্লাবের জন্য। ২০০৮ সালে ফিফা সেরা খেলোয়ার এওয়ার্ড পান, এমনকি তিনটি প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিততে সহায়তা করেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডকে।

২০০৯ সালে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে পাড়ি জমান রেকর্ড ১৩১ মিলিয়ন ডলারের বিনিময়ে! তারপর থেকে রিয়ালকেই তাঁর স্থায়ী ঠিকানা বানিয়ে নিয়েছিলেন । ক্লাবটির ইতিহাসের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবেও ফুটবলপ্রেমীদের কাছে বিবেচিত হন তিনি।

তবে সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত টেকেনি। ২০১৭ - ২০১৮ মৌসুমে সব সম্পর্ক শেষ করে জুভেন্টাসে পাড়ি জমান তিনি।

রোনালদোকে কিনতে রিয়ালকে ১০৫ মিলিয়ন ইউরো ট্রান্সফার ফি দিয়েছে জুভেন্টাস। তবে এটাই চূড়ান্ত খরচ নয়, আনুষঙ্গিক আরও খরচের বোঝাও বইতে হয়েছে ‘তুরিনের ওল্ড লেডি’দের।

রোনালদোর ইচ্ছানুযায়ী রিয়াল তাঁকে ১০০ মিলিয়ন ইউরোতেই ছেড়ে দিতে রাজি ছিল। এর সঙ্গে ‘অ্যাড-অনস’ আরও ৫ মিলিয়ন দিয়েছে জুভেন্টাস। মোট ১০৫ মিলিয়ন ইউরো গুনতে হয়েছে ইতালিয়ান ক্লাবটিকে। কিন্তু রিয়ালের বাইরে আরও একজনকে ২০ মিলিয়ন ইউরো দিতে হয়েছে তাদের। সেই ‘একজন’ রোনালদোর এজেন্ট হোর্হে মেন্দেজ। মোট দলবদলের ২০ শতাংশ অর্থ পাবেন এই ‘সুপার এজেন্ট’। আর এতেই ২০ মিলিয়ন ইউরো পাচ্ছেন তিনি।

জুভেন্টাসে বছরে রোনালদো আয় করবেন ৩০ মিলিয়ন ইউরো। যদিও ক্লাবটিতে তাঁর মূল বেতন ৬০ মিলিয়ন ইউরো। ইতালিয়ান আইনে কোনো খেলোয়াড়কে মোট বেতনের অর্ধেক কর দিতে হয়। সবকিছু মিলিয়ে জুভেন্টাসে ৪ বছরের চুক্তিতে মোট ২৪০ মিলিয়ন ইউরো পারিশ্রমিক পাবেন রোনালদো। এ ছাড়া ‘সলিডারিটি ফি’ হিসেবে জুভেন্টাসকে আরও ৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করতে হয়েছে। দলবদল সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতেই এই ‘সলিডারিটি ফি’।

দলবদল আর সব খরচ মিলিয়ে ৪ বছরে রোনালদোর পেছনে জুভেন্টাসকে ঢালতে হবে মোট ৩৭০ মিলিয়ন। রোনালদোর ট্রান্সফার ফি, অ্যাড-অনস, এজেন্ট ফি আর বেতন মিলিয়েই এই হিসাব।

রোনালদো রিয়াল মাদ্রিদ ছেড়ে আসায় স্পনসর হিসেবে আর থাকছে না গাড়ি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান অডি। তবে ইতালিতে তাঁর নতুন গাড়ির স্পনসর হবে ফিয়াট। এই প্রতিষ্ঠান জুভেন্টাস সভাপতির মালিকানাধীন। এই স্পনসর ধরে চার বছরে রোনালদোর পেছনে মোট ৪০০ মিলিয়ন ইউরোর বেশি খরচ হবে জুভেন্টাসের। অবশ্য শেয়ারের দাম, জার্সি বিক্রিসহ সবকিছু মিলিয়ে ৪০০ মিলিয়ন ইউরো তুলতে বেশি সময়ও লাগবে না টানা সাতবারের সিরি ‘আ’ জয়ীদের।

শুধু ক্লাবেই নয়, জাতীয় দলেও রোনালদো লড়াকু সিংহের মতোই খেলেন! পর্তুগালের জার্সি গায়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। বলতে গেলে তাঁর উপর ভর করেই ফুটবলের পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পর্তুগাল, স্বপ্ন দেখেছে বিশ্বকাপেও অভাবনীয় কিছু করে দেখানোর।
ছোট্ট সেই ছেলেটি: 
নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের মাঠে কার্লোস রেক্সাস হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। মাঠের সবথেকে ছোটখাটো, সবথেকে দুর্বল ছেলেটা তার থেকে আধহাত লম্বা সব খেলোয়াড়দের বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে একের পর এক গোল দিয়েই যাচ্ছে! বলটা মনে হচ্ছে চুম্বক দিয়ে ওর পায়ে লাগানো আছে, পা থেকে সরছেই না! বাকি খেলোয়াড়রা একটু পর মনে হলো হাল ছেড়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে গেল, আর ছোট ছেলেটা বড় বড় গোল দিতে লাগলো

এখানে কার্লোস রেক্সাসের পরিচয়টা দেয়া ভালো। বার্সেলোনার সাবেক খেলোয়াড় ও কোচ এই ভদ্রলোকের তখনকার কাজ ছিল দেশে বিদেশে ঘুরে ঘুরে বার্সার বিখ্যাত ‘লা মেসিয়া’ একাডেমির জন্যে প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে বের করা। ফুটবলের ভাষায় যাকে বলে ‘স্কাউট’।

অদ্ভুত আবিষ্কার:
কার্লোস রেক্সাস আর্জেন্টিনায় এসেছিলেন প্রতিভার খোঁজে। সেবার আর্জেন্টিনার কিশোর ফুটবলারদের দেখে তেমন মন ভরছিল না তাঁর, তিনি খুঁজছিলেন এমন কাউকে, সবার মাঝে অনন্য হবে যে, ইংরেজিতে ‘Standout’ বলা হয় যাকে। বোকা জুনিয়র্স থেকে শুরু করে অন্যান্য বড় বড় আর্জেন্টাইন ক্লাব ঘুরে যে খোঁজ তিনি পাচ্ছিলেন না, নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজের মতো ছোট ক্লাবের মাঠে বুঝি তাঁর মনের মতো ফুটবলার পেয়ে গেলেন! বুঝে গেলেন, এই মানিক হাতছাড়া করা হবে বিশাল বোকামি।



ছেলের নাম লিওনেল মেসি। বাবা হোর্হে মেসি ছিলেন পেশায় স্টিল ফ্যাক্টরির ম্যানেজার। মা সেলিনা কাজ করতেন কারখানায়। রেক্সাস সটান চলে গেলেন মেসির বাবা-মা এর কাছে। একেবারে সোজাসাপ্টা বলে দিলেন, বার্সেলোনার একাডেমির জন্যে তাঁদের মেসিকে চাই। মেসির বাবা-মার উত্তরটা অবাক করে দিলো তাঁকে।

বিরল এক সমস্যা: 

“মেসি আর বড় হবে না?” কার্লোস রেক্সাস যেন আকাশ থেকে পড়লেন। হোর্হে মেসি খুলে বললেন। মেসির একটা বিরল সমস্যা আছে। তার গ্রোথ হরমোনের বড় একটা ঘাটতি আছে, আর এই গ্রোথ হরমোন না থাকলে সে আর কখনো বড় হতে পারবে না। হোর্হে-সেলিনা মিলে ডাক্তার দেখিয়েছেন, এই সমস্যার সমাধানও পেয়েছেন।

কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত আয়ের এই দম্পত্তির পক্ষে প্রতি মাসে শ’য়ে শ’য়ে ডলার খরচ করে মেসির থেরাপি করা অসম্ভব। আর তাই মেসিকে নিয়ে তাঁরা মহা শঙ্কিত, বাচ্চা ছেলেটার কী যে হবে!
সমস্যা থাকলে সমাধান থাকবেই!

সবকিছু জেনেও হাল ছাড়লেন না রেক্সাস। মানুষটা হার মানতে জানেন না। সেবারের মতো ফিরে গেলেন তিনি বার্সেলোনায়, সাথে নিয়ে গেলেন ছোট্ট মেসির পায়ের অস্বাভাবিক জাদুর স্মৃতি। শুধু ফিরলেনই না, বার্সা বোর্ডকে রাজিও করালেন মেসির হরমোনের চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্যে। সময়টা একবিংশ শতাব্দীর প্রথম বছর, ২০০০ সাল।

আরেকটা সমস্যা ছিল, মেসি বাবা-মাকে ছাড়া কীভাবে থাকবে? সেটারও সমাধান হলো, মেসির বাবা-মা চলে এলেন স্পেনে, ছোট্ট একটা বাসা ভাড়া নিলেন। এক মেসির জন্যে এতোটা ত্যাগ স্বীকার করলেন হোর্হে-সেলিনা দম্পতি- নিয়তি তাঁদের এই ঋণ সুদসমেত ফেরত দিতে দেরি করেনি!

স্পেনজীবন, বন্দী জীবন:
বার্সেলোনায় প্রথম দিকে মেসি একেবারেই মানিয়ে নিতে পারছিল না। আর্জেন্টিনার সাথে স্পেনের অনেক ফারাক, ততদিনে কিশোর মেসি সেটা ভালোমতোই বুঝে ফেলেছে। লা মেসিয়ায় প্র্যাক্টিসের সময়টাই শুধু ভালো লাগে তার, ফুটবল যে মেসির বড় আপন! অন্য সময়টায় কেমন একটা বন্দী ভাব হয় তার। ধীরে ধীরে এই সমস্যা থেকেও বের হতে পারলো মেসি, লা মেসিয়ায় সেস্ক ফ্যাব্রেগাস, জেরার্ড পিকের মতো বন্ধু জুটে গেল তার!

লা মেসিয়ার খেলোয়াড়দের সাধারণত চার পাঁচ বছর লেগে যায় মূল একাদশ এমনকি বার্সা বি দলে সুযোগ পেতে। মেসি এখানেই অনন্য। লা মেসিয়ায় যোগ দেয়ার তিন বছরের মধ্যেই নিজের কারিকুরি দিয়ে সুযোগ করে নেন বার্সেলোনা মূল দলে! সালটা ২০০৩।

অভিষেক: বার্সেলোনা দলে তখন রোনালদিনহো, ক্লাইভার্টদের মতো তারকার মেলা। সেখানেও নিজের শৈলী দেখাতে ভুল করেনি মেসি, ষোল বছর বয়সেই বার্সেলোনা কোচের চোখে পড়ে যেতে দেরি হলো না মেসির।

সে বছর মূল দলে আরো একজন তারকার অভিষেক হয়েছিল। নাম তাঁর আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা, যাকে বলা যায় একবিংশ শতাব্দীর সেরা মিডফিল্ডারদের একজন। মেসির অবশ্য মূল দলে মোটামুটি নিয়মিত হতে আরো সময় লেগেছে।

২০০৫ সাল। পহেলা মে। দিনটা আজও স্প্যানিশ ফুটবলের রেকর্ড বুকে অমলিন, মাত্র ১৭ বছর বয়সে বার্সেলোনার পক্ষে কনিষ্ঠতম গোলদাতা হিসেবে গোল করে মেসি, যে রেকর্ডটা আজো কেউ ভাঙ্গতে পারে নি কেউ। সে বছরই অনূর্ধ্ব ২০ বিশ্বকাপ জিতে বিশ্ব ফুটবলে মেসি জানান দিয়ে দেয় নিজের প্রতিভার।

সাফল্যগাঁথা:
সেই যে শুরু, এরপর থেকে মেসিকে আর রুখে কে? ২০০৯ থেকেই একরকম অপ্রতিরোধ্য লিওনেল মেসি, পাঁচ পাঁচবার বিশ্বসেরা ফুটবলার হয়েছেন, এর মধ্যে টানা বিশ্বসেরা হয়েছেন চারবার! নামের পাশে একগাদা রেকর্ড, একগাদা এওয়ার্ড। বার্সার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোল করেছেন, করিয়েছেন। বার্সার হয়ে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ ছয়টি কাপ জিতেছেন, আরো কত শত কৃতিত্ব যে তাঁর ঝুলিতে, বলে শেষ করা যাবে না।

সবথেকে বড় কথা হলো, বিশ্বের সেরা দু’জন খেলোয়াড়ের একজন হবার পরেও, পৃথিবীর সবথেকে ধনী অ্যাথলেটদের একজন হবার পরেও মেসি এখনও ওল্ড বয়েজের সেই নির্লিপ্ত, সরল ছোট্ট ছেলেটিই আছেন। যশ তাঁকে ছোঁয়নি, অহমিকা তাঁকে আঁকড়ে ধরেনি।

আর তাই মেসিই বিশ্বের সেরা খেলোয়াড় কি না, এমন প্রশ্নে মেসির সহজ সরল উত্তর:
“কে সেরা এটা আমার মাথাব্যথা নয়, বার্সেলোনা রিয়াল মাদ্রিদের থেকে ভালো খেললেই চলবে!” বিশ্বসেরা হবার পরেও তাঁর এই নম্রতা আমাদের মুগ্ধ করে, অবাক করে। প্রতিনিয়ত ফুটবলের জাদু দিয়ে মুগ্ধ করছেন যিনি সারা বিশ্বকে, বাস্তব জীবনে সেই মেসিই অদ্ভুত সরল! সম্প্রতি বিয়েও করেছেন ছোটবেলার বান্ধবী আন্তোনেল্লা রোকুজ্জোকে। এত যশ, এত বিত্তের মালিক হয়েও উদ্দাম জীবনযাপন তাঁকে টানেনি, মেসি রয়ে গেছেন সেই ছোটবেলার মেসিই।

অপ্রাপ্তি:
মেসির ক্যারিয়ারে একটাই অপ্রাপ্তি, দেশের হয়ে অলিম্পিকের বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট ছাড়া আর কিছুই জেতা হয় নি তাঁর। একটা বিশ্বকাপের খুব দরকার এই কিংবদন্তীর। ২০১৪-তে বিশ্বকাপের খুব কাছাকাছি গিয়েও ছুঁতে পারেনি আর্জেন্টিনা, দলটির আশা ভরসা সব এই মেসিকে ঘিরেই। রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি আজ আর্জেন্টিনা দলের ক্যাপ্টেন, বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নটাও বোনা মেসিকে ঘিরেই।

মেসি কেবল আর্জেন্টাইন এক কিংবদন্তী কিংবা বার্সার সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ই নন। সারা বিশ্বের হাজারো মানুষের জন্যে এক অনুপ্রেরণা লিওনেল আন্দ্রেস মেসি কুচ্চিতিনি নামের ছোটখাটো এই ফুটবল খেলোয়াড়। হরমোনের ঘাটতি, বাবা-মায়ের দারিদ্য- কোনকিছুই তাঁকে রুখতে পারে নি সেরা হওয়া থেকে। সকল বাধাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে অমরত্বের পথে এগিয়ে গিয়েছেন মেসি, সাফল্যের স্বর্ণশিখর আগলে নিয়েছে তাঁকে, পরম যতনে।


আজকের কিংবদন্তির যে গল্পটি আপনাদের বলব, তার যুগে বিশ্বজুড়ে ছিল না ইন্টারনেটের প্রচলন, অথবা ইউটিউব ঘেঁটে ইচ্ছা করলেই কেউ ইচ্ছেমতো ভিডিও ক্লিপ দেখতে পারত না! তবুও সে সময় তিনি কাঁপিয়েছিলেন পুরো দুনিয়া। ‘হ্যান্ড অফ গড’ খ্যাত এই তারকাকেই ফুটবলের সর্বসেরা খেলোয়াড় হিসেবে মানেন বিশ্বের অধিকাংশ ফুটবলবোদ্ধারা। যদি কোন ফুটবল ভক্তকে ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফুটবলার বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে হয়তো প্রথমেই তার মুখ থেকে উচ্চারিত হবে আর্জেন্টাইন কিংবদন্তি খ্যাত ডিয়েগো ম্যারাডোনার নাম।

তবে কয়েক প্রজন্ম পরে কেউ হয়তো আর গল্প করবে না, কিভাবে ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ম্যারাডোনা ইংল্যান্ড রক্ষণভাগকে বিধ্বস্ত করেছেন, অথবা ১৯৯০ সালে কিভাবে নেপোলি ফুটবল ক্লাবের সমর্থকরা নিজ দেশকে সমর্থন না করে ম্যারাডোনার পক্ষে জয়ধ্বনি গেয়েছে, কিংবা ১৯৯৪ সালে এই ফুটবল ঈশ্বর নাইজেরিয়ার বিপক্ষে জেতার পর কি রকম প্রাণবন্ত উদযাপন করেছিলেন! প্রবীণ আর্জেন্টিনা অথবা ম্যারাডোনা সমর্থকরা হয়তোবা এসব গল্পই তাদের পরবর্তী প্রজন্মগুলোকে শুনিয়ে থাকবেন। ম্যারাডোনার সেই ইতিহাসগড়া গল্পগুলোই আজ আমাদের আলোচ্য বিষয়।


ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা! আর্জেন্টাইন রাজধানী বুয়েনস আয়ার্স শহরের ভিলা ফিওরিতো নামক জায়গায় ১৯৬০ সালে জন্ম তার। ছোটকাল থেকেই অনেক কোলাহলের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন ম্যারাডোনা। পরিবারে তার ভাই বোনের সংখ্যা ছিল মোট ৭ জন। তবে অন্যদের চেয়ে তিনি ছিলেন একটু আলাদা। ফুটবল নিয়ে সারাদিন মেতে থাকতেন তিনি। লস কেবোলিতাস ক্লাবের হয়ে খেলার সময় তিনি প্রথম সবার নজর কাড়েন।
পুরো আর্জেন্টিনা জুড়ে সহসাই তিনি ‘বিস্ময় বালক’ বনে যান। কোন ম্যাচের অর্ধসময়ের বিরতিতে এই ১০ বছরের বালক দর্শকদের তার পায়ের অনবদ্য কৌশল দেখিয়ে মাতিয়ে রাখতেন। খর্বকায়, বাঁ-পেয়ে এই খেলোয়াড় বল নিয়ন্ত্রণ, ড্রিবলিং, পাসিং আর প্লে মেকিংয়ে ছিলেন অন্য সবার থেকে অনেক ধাপ উপরে। ক্ষুদে ম্যারাডোনা তখনকার সময়ে একটি সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “আমার জীবনে দুইটি স্বপ্ন- বিশ্বকাপ খেলা আর সেটি জয় করা!”

মাত্র ১৫ বছর বয়সে তিনি আর্জেন্টাইন প্রথম বিভাগের তলানির ক্লাব আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সের মূল দলে যোগ দেন। অন্যদিকে ১৯৭৭ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে হাঙ্গেরির বিপক্ষে তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অভিষেক হয়। আর্জেন্টাইন লিগে আর্জেন্টিনোসের হয়ে তিনি ৫ বার সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। এছাড়া তিনি ১৯৭৯ এবং ১৯৮০ সালে ‘সাউথ আমেরিকান প্লেয়ার অফ দ্য ইয়ার’ খেতাবও অর্জন করেন।

তবে তিনি তার জীবনের প্রথম বড় কষ্টটি পান যখন ১৯৭৮ সালে নিজ দেশে অনুষ্ঠিতব্য বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করা হয়। কোচ সিজার লুইস মেনত্তি মনে করেছিলেন যে, একজন ১৭ বছরের বালক হিসেবে ম্যারাডোনা বিশ্বকাপের মত বড় টুর্নামেন্টের চাপ নিতে পারবেন না। দুর্ভাগ্যবশত তিনিই ছিলেন শেষ খেলোয়াড় যাকে কিনা ২২ সদস্যবিশিষ্ট স্কোয়াড থেকে ছাটাই করা হয়। তবে পরের বছরই তিনি পুরো বিশ্বকে নিজের সামর্থ্যের জানান দেন। ১৯৭৯ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড ইয়ুথ কাপ’ এ নিজ দেশ আর্জেন্টিনাকে শিরোপা এনে দেন তিনি।


আর্জেন্টাইন ক্লাব বোকা জুনিয়র্স এ ম্যারাডোনা
অন্যদিকে ক্লাব পর্যায়ে খ্যাতনামা আর্জেন্টাইন ক্লাব বোকা জুনিয়র্স থেকে তাঁর ডাক আসে। ১ মিলিয়ন পাউন্ডের বিনিময়ে তাঁকে দলে ভেড়ায় বোকা জুনিয়র্স। ১৯৮১ সালে বোকা জুনিয়র্সের হয়ে আর্জেন্টাইন চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার মধ্য দিয়ে ম্যারাডোনার  জয়রথ শুরু হয়।
এরপরই ইউরোপ পাড়ি দেওয়ার সুযোগ আসে ম্যারাডোনার কাছে! এফসি বার্সেলোনা তৎকালীন ট্রান্সফার রেকর্ড ভেঙে ৫ মিলিয়নের বিনিময়ে ডিয়েগো ম্যারাডোনাকে কিনে নেয়। অবশ্য তাদের এই প্রচেষ্টা বিফলে যায়নি। ১৯৮৩ সালে তিনি বার্সেলোনাকে লিগ কাপ এবং স্প্যানিশ কাপ জেতান। ১৯৮৪ সালে ম্যারাডোনা একই ক্লাবের হয়ে জেতেন সুপার কাপ।
কিন্তু নিঃসন্দেহে তাঁর ক্লাব দ্বৈরথের সবচেয়ে সাফল্যঘন মুহূর্তগুলো এসেছিল ইতালির নেপোলি ক্লাবের হয়ে। তখনকার অপেক্ষাকৃত অসফল ক্লাব নেপোলিকে তিনি ১৯৮৭ এবং ১৯৯০ সালে দুইবার ক্লাব শিরোপা এনে দেন। ইটালির দক্ষিণাঞ্চলের এই ক্লাবকে আরও এনে দেন ১৯৮৭ সালে কোপা ইটালিয়া, ১৯৮৯ সালের উয়েফা কাপ এবং ১৯৯১ সালের ইটালিয়ান সুপার কাপ শিরোপা।

ফুটবলে তাঁর সর্বোচ্চ সাফল্যের কাছে হয়তোবা এসব শিরোপা অনেকটাই মলিন। কতজন ফুটবলার-ই বা বিশ্বকাপ ইতিহাসে পুরোপুরি একক নৈপুণ্যে নিজের দেশকে সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল শিরোপা উপহার দিতে পেরেছেন! ১৯৮৬ সালে তিনি সেটা করে দেখিয়েছেন। একটি পুরোপুরি তারকাহীন দলকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ এনে দিয়েছেন। কষ্টদায়ক হলেও সত্যি, ফুটবল মাঠে তাঁর তীক্ষ্ণ প্রতিভা সত্ত্বেও আবেগপ্রবণ এবং পরিবর্তনশীল চিন্তাধারা তার ক্যারিয়ারকে বার বার বিতর্কিত করেছে। তবুও তিনি ভক্তদের মনে সর্বদা তার ফুটবল কারুকার্যের জন্যই স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।

বিশ্ব পর্যায়ে খুব কম ক্রীড়াবিদই ম্যারাডোনার মতো একাধারে এত প্রশংসা এবং সাফল্য  অর্জন করেছেন। পায়ের অসম্ভব সব কেরামতি আর অতুলনীয় ড্রিবলিং কৌশল ফুটবল মাঠে গোল তৈরি করে দেওয়ার পথে তাঁকে অপ্রতিরুদ্ধ করে তুলেছিল। মাঠে চতুর্দিক থেকে কড়া পাহারায় থাকা সত্ত্বেও তিনি ডিফেন্ডারদ্র বেষ্টনী থেকে এমনভাবে বল কাটিয়ে নিয়ে  বের হয়ে যেতেন, যেমনটি কেউ আগে কখনো দেখেনি!
তাঁর সবচেয়ে তুঙ্গে থাকা মুহূর্তে তিনি দলের সকল দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিতেন এবং নিজের সর্বস্ব দিয়ে দলকে এনে দিতেন কাপ বা লিগ শিরোপা।

 আর্জেন্টিনা , স্পেন, ইটালি আর স্কটল্যান্ডের ভক্তরা তাকে সম্মান প্রদর্শন করে বিশ্বজয়ী হিসেবে। তারা এটাও মানেন যে, তিনি ফুটবলের সর্বকালের সবচেয়ে বড় তারকাগুলোর মধ্যে একজন। ইংল্যান্ডের ফুটবল ভক্তরাও ম্যারাডোনাকে সমীহ না করে পারেন না,  যদিও ১৯৮৬ সালের ‘হ্যান্ড অফ গড’ এর স্মৃতি তাদের এখনও কাঁদায়। সেই ম্যাচে ইংল্যান্ডকে আর্জেন্টিনা হারিয়েছিল ২-১ ব্যবধানে আর ম্যারাডোনা উঁচুতে লাফিয়ে হাতের সাহায্য নিয়ে একটি গোল করেছিলেন। জর্জ ভালদানোর উদ্দেশ্যে বাড়ানো ম্যারাডোনার পাসটি প্রতিরোধ করেন ইংলিশ ডিফেন্ডার স্টিভ হজ এবং বলটি নিজ পেনাল্টি বক্সেই পাঠান তিনি। ক্ষুদে ডিয়েগো বক্সের ভিতরে দৌড়াতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত নিজের সুযোগটি কাজে লাগান। গোলরক্ষক পিটার শিল্টনকে পরাস্ত করে নিজের বামহাতটি উঁচিয়ে বল প্রতিপক্ষের জালে জড়ান।

বুদ্ধিমান ম্যারাডোনা পরবর্তীতে গোলটি সম্পর্কে মন্তব্য করেন, “গোলটি হয়েছে অনেকটা ম্যারাডোনার হেডের মাধ্যমে এবং অনেকটা ঈশ্বরের হাতের মাধ্যমে”।
তবে ম্যাচে এমন একটি আশ্চর্যজনক গোলের মাত্র ৫ মিনিট পরেই এই আর্জেন্টাইন আক্রমণভাগের খেলোয়াড় বিপক্ষদলের ৬ জনকে কাটিয়ে অভূতপূর্ব একটি গোল করেন, যার ফলে এমনকি তার বিদ্বেষীদের কাছেও তিনি সম্মান এবং প্রফুল্লের পাত্র বনে যান। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে তিনি এছাড়া আরও ৩ টি গোল করেন এবং আরও ৫ টি অ্যাসিস্ট করেন। অবশেষে দলের জন্য এই আর্জেন্টাইন জিতে নেন ১৯৮৬ সালের ফিফা ফুটবল বিশ্বকাপ জয়মুকুট। সত্যি বলতে কি, ঐসময় ‘ফুটবল ঈশ্বর’-খ্যাত ডিয়েগো ম্যারাডোনা ছাড়া আর্জেন্টাইনদের পক্ষে হয়তো ফুটবলের সর্বোচ্চ দলীয় সম্মান জেতা সম্ভব ছিল না।

  আরজেন্টিনোস জুনিয়র্সের যুবদল কোচ ফ্রান্সিস্কো করনেজো, যিনি ম্যারাডোনাকে প্রথম আবিষ্কার করেন তিনি বলেন, “যখন ডিয়েগো আর্জেন্টিনোস জুনিয়র্সে প্রথম ট্রায়ালের জন্য এসেছিল তখন তার প্রতিভায় আমি সত্যি বিস্মিত হয়েছিলাম এবং বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে সে ছিল মাত্র ৮ বছরের বালক। আমরা তার আইডি কার্ড দেখতে চেয়েছিলাম কিন্তু সে বলল যে তার কাছে কোন আইডি কার্ড নেই। আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে সে আমাদের মিথ্যা বলছিল, কারণ তার শরীরের গঠন একটি বালকের মতো হলেও সে একজন প্রাপ্তবয়স্কের মতো খেলছিল। যখন আমরা পরে নিশ্চিত হলাম যে, তার কথা সত্যি তখন আমরা তার উপর খাঁটি আস্থা রাখার সিদ্ধান্ত নিলাম।”



সাবেক আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় জর্জ ভালদানো বলেন, “কৌশলগত দিক থেকে সে ছিল ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে নিখুঁত খেলোয়াড়!”
আর্জেন্টাইন বিশ্বকাপজয়ী ফুটবল তারকা অসি আরদিলেস বলেন, “লোকে আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞাসা করে থাকে যে কে বেশি ভাল খেলোয়াড় ছিল, পেলে নাকি ম্যারাডোনা। কিন্তু আপনি আসলে এই দুজনের মধ্যে তুলনা করতে পারেন না। পেলে প্রচুর গোল করত, ম্যারাডোনা গোল তৈরি করে দিত। অবশ্য ম্যারাডোনাও অনেক গোল করেছে, তবে সে গোলের প্রচুর সুযোগ তৈরি করেছে, শুধুমাত্র তার পাসগুলো দিয়ে নয়, বরং তার দলের অন্যদের সুযোগ করে দিয়ে। কারণ বিপক্ষ দলের ২ অথবা ৩ জন খেলোয়াড় সর্বদা ম্যারাডোনার পিছনে আঠার মতো লেগে থাকত। তার সবচেয়ে সাফল্যের মুহূর্ত এসেছে ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে। ইংল্যান্ডের মানুষ প্রায়ই ‘হ্যান্ড অফ গড’ গোলটির সমালোচনা করে থাকে, তবে ওই ম্যাচের ২য় গোলটি ছিল বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকালের সেরা গোল।”