Articles by "ইসলামী মূল্যবোধ"
Showing posts with label ইসলামী মূল্যবোধ. Show all posts

বদর যুদ্ধে উভয় বাহিনী পরস্পরের মুখোমুখি হয় এবং যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এ সময় মুসলমানদেরকে লক্ষ্য করে রাসুল [সা] বলেন- এগিয়ে যাও সেই জান্নাতের দিকে যার প্রশস্ততা আকাশ-জমিন বরাবর।
বদর যুদ্ধে ইসলামের প্রথম শহিদ হয়েছেন যিনি!

রাসুল [সা]-এর জবান মুবারকে এ কথা উচ্চারিত হতেই হজরত উমায়র ইবনে হুমাম আনসারি [রা] বললেন- হে আল্লাহর রাসুল, সেই জান্নাত কি আকাশ ও পৃথিবী বরাবর? রাসুল [সা] বললেন- হ্যাঁ! এতে উমায়র [রা] বলে উঠলেন- বাহ! বাহ! রাসুল [সা]তখন তাকে লক্ষ্য করে বললেন- এ তুমি কী বলছ? উমায়র রা. বললেন- হে আল্লাহর রাসুল, না, অন্য কিছু নয়। আমি এই ধারণার বশে বলছি যাতে এই জান্নাত আমার ভাগ্যে জুটে যায়। রাসুল [সা] বললেন- হ্যাঁ, হ্যাঁ, তুমি এই জান্নাত লাভ করবে। 

এরপর উমায়র [রা] তার তূণীর থেকে কিছু খেজুর বের করলেন এবং খেতে লাগলেন। এরপর হঠাৎ করেই বলে উঠলেন- যদি আমি এই খেজুরগুলো শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করি তাহলে অনেক বেশি দেরী হয়ে যাবে। এতক্ষণ বেঁচে থাকার মত ধৈর্য আমার নেই। এই বলে বাকি খেজুরগুলো তিনি ছুঁড়ে ফেলে দিলেন এবং যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং শহিদ হয়ে গেলেন। বদর যুদ্ধে তিনিই ছিলেন প্রথম শহিদ। (নবিয়ে রহমত)

‘ক্যাসিনো’ শব্দটি ইতালিয়ান। ক্যাসিনো বলতে বোঝায় যেখানে জুয়া, নাচ, গান ও বিভিন্ন খেলাধুলার সংমিশ্রণ থাকে। অভিধানে এর অর্থ হলো নাচঘর; জুয়া খেলার ঘর; তাসখেলা; বা আমোদপ্রমোদের কক্ষ। বাংলা একাডেমির ‘ইংলিশ-বাংলা ডিকশনারিতে’ এর অর্থ বলা হয়েছে, ‘জুয়া ও অন্যান্য বিনোদনমূলক ক্রিয়াকলাপের জন্য ব্যবহৃত কক্ষ বা ভবন; সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নৃত্যশালা।’ জুয়াকে আরবিতে বলা হয় ‘আল-কিমার’ ও আল-মায়সির’। আর খিমার এবং মাইসির শব্দ দু’টি সমার্থবোধক। বাংলা ও উর্দুতে এর প্রতিশব্দ হচ্ছে জুয়া।

১৬৩৮ সালে ইতালির ভেনিসে সর্বপ্রথম জুয়ার মাধ্যমে ক্যাসিনো ব্যবসায় শুরু হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা গেছে। ইসলামের সূচনালগ্নের আগেও নবী করিম সা:-এর আগমনের সময় তৎকালীন মক্কায় নানা ধরনের জুয়ার প্রচলন ছিল। তিনি সবগুলোকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। ইসলামী শরিয়তে জুয়ার যাবতীয় প্রক্রিয়াকে হারাম ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরগুলো শয়তানের কার্য ছাড়া কিছু নয়। অতএব, এগুলো থেকে বেঁচে থাক, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করে দিতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামাজ থেকে তোমাদের বিরত রাখতে। অতএব, তোমরা এখন কি নিবৃত্ত হবে?’ (সূরা মায়েদা : ৯০-৯১)। 

আবদুুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিতÑ রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না’ (দারেমি, হাদিস নং ৩৬৫৬)। কিছু লোকের কাছে মনে হতে পারে, জুয়া একটি লাভজনক ব্যবসায়। কিন্তু এর সামান্য কিছু লাভ থাকলেও ক্ষতির পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণে বেশি। যেমনÑ সূরা বাকারার ২১৯ নম্বর আয়াতে এসেছে, ‘হে মুহাম্মদ! তারা আপনাকে মদ এবং জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। আপনি বলে দিন, এ দুটোর মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর এতে মানুষের জন্য সামান্য কিছু উপকারিতাও রয়েছে। তবে এগুলোতে উপকারিতা অপেক্ষা ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি।’

জাহেলি যুগে শুধু ধন-সম্পদের উপরেই জুয়া হতো না, বরং কখনো কখনো স্ত্রীদেরকেও জুয়ার সওদা হিসেবে পেশ করা হতো। যা ধীরে ধীরে আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে শুরু করেছে। লটারি, জুয়া খেলাকে আপাতদৃষ্টিতে নির্দোষ আনন্দ মনে হলেও এর সামাজিক, অর্থনৈতিক প্রভাব ভয়ঙ্কর। শুধু আমেরিকাতেই বছরে ৫৪ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় জুয়ার কারণে। প্রতি রাতে বা প্রায়ই ক্যাসিনোয় যাওয়া, গিয়ে কিছুক্ষণ ঘুরে আসা, বা পকেট খালি করে বা পকেট ভরে নীড়ে ফেরা লোকগুলো জুয়াশক্ত আসল জুয়াড়ি। এরা এক ধরনের মানসিক রোগীও বটে। এই রোগ থেকে বেরিয়ে আসা অনেক কঠিন। জুয়া যখন একজন মানুষের চিন্তাভাবনা, কাজ-কর্ম, আচার-আচরণ সব কিছু নীরবে গ্রাস করে নেয়, যখন বারবার চেষ্টা করার পরও সেই কাজ থেকে বিরত থাকা যায় না। ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক, পারিবারিক বা সামাজিক সব সম্পর্ক নষ্ট হতে থাকে, তখন ব্যক্তি মানসিক রোগীতে পরিণত হওয়ার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কেউ ব্যবসায়ের নামে, কেউ লোভনীয় পুরস্কারের অফার দিয়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এটাকে ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় সমাজের প্রভাবশালী লোকেরা এর পেছনে ইন্ধন জোগায়। এ ক্ষেত্রে অনেকে জানে, তারা যা করছে সেটা হারাম বা অন্যায়। আবার অনেকে জানেই না যে, লটারি বা জুয়া খেলা হারাম। 

আমাদের সমাজে লটারির নামে প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে, অলিতেগলিতে, শহরে কিংবা গ্রামে নামে-বেনামে জুয়ার রমরমা ব্যবসায় চলছে। কৃষক, তরুণ, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীরা জড়িয়ে পড়ছেন মরণনেশা জুয়ায়। এসব আসরে উড়ছে লাখ লাখ টাকা। বর্তমানে জুয়াবাজির জন্য বিভিন্ন রকমের আসর বসে বিভিন্ন স্থানে। কোথাও হাউজি আবার কোথাও সবুজ টেবিল নামে। ফুটবল ও অন্যান্য খেলাধুলার প্রতিযোগিতায়ও বাজি ধরা হয়। প্রাচীন পদ্ধতি ছাড়াও জুয়ার আরো বহু নতুন নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার হয়েছে। যেমন- ফ্লাস, পাশা, বাজি রেখে ঘোড়দৌড়, তাসখেলা, চাকতি ঘোরানো ও রিং নিক্ষেপ প্রভৃতি। এগুলোর সবই কিন্তু হারাম। 

আজ যদি ধর্মপ্রাণ মানুষেরা অনৈতিক এসব কর্মকাণ্ড বন্ধে প্রতিবাদ না করে মুখ বন্ধ করে বসে থাকেন, সমাজের কর্তাব্যক্তিরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে এর প্রতিরোধে কাজ না করেন, তাহলে প্রকাশ্যে আল্লাহর সাথে বিদ্রোহের শাস্তি থেকে আমরা কেউই রক্ষা পাবো না। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, তিন প্রকার লোকের জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন- ১. সদা মদ পানকারী; ২. বাবা-মায়ের অবাধ্য; ৩. দাইয়ুস (মুসনাদে আহমদ : ৫৩৭২)। অন্যত্র আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা: থেকে বর্ণিত, রাসূল সা: বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তায়ালা মদ, জুয়া ও বাদ্যযন্ত্র হারাম করেছেন’ (বায়হাকি : ৪৫০৩; মিশকাত : ৪৩০৪)। 

বর্তমান ক্যাসিনো সংস্কৃতি মদ-জুয়াকে দিয়েছে দুর্ধর্ষ গতি। জুয়ার আধুনিক সংস্করণ ক্যাসিনোর মাধ্যমে পুরো জাতির অর্থ জমা হচ্ছে গুটিকয়েক জুয়াড়িদের লকারে। শত শত কোটি টাকা অচল হয়ে পড়ে আছে ওদের গুদামঘরে। এই টাকাগুলো কুক্ষিগত না হলে জাতীয় জীবনে আসতে পারত অনেক সমৃদ্ধি। ক্যাসিনো সংস্কৃতির কবলে পড়ে আজ জাতীয় অর্থনীতি হুমকির মুখে। সরকারের বহুবিধ উন্নয়ন ম্লান করে দিয়েছে জুয়াড়িদের এই ক্যাসিনো সংস্কৃতি। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসূল সা: বলেন, ‘বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান, জুয়ায় অংশগ্রহণকারী, খোঁটাদাতা ও মদ্যপায়ী জান্নাতে যাবে না’ (দারেমি : ৩৬৫৩; মিশকাত : ৩৪৮৬)।

লেখক : মাওলানা আমিনুল ইসলাম

এক ঈদের রাতের ফজিলত ও আমল : দুই ঈদের রাত অত্যন্ত গুরুত্ব¡পূর্ণ এবং মর্যাদাপূর্ণ। ঈদ যেমন আনন্দের বারতা নিয়ে আসে, তেমন নিয়ে আসে আল্লাহর নৈকট্যলাভের মহাসুযোগ। ঈদের রাত যেমন আনন্দ-খুশির, ঠিক দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ ও মঙ্গলপ্রাপ্তির রাত; জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাতলাভের মহাসুযোগপ্রাপ্তির রাত। তাই ঈদের রাত জেগে ইবাদত করার ফজিলত ও গুরুত্ব অনেক। ঈদের রাতের ফজিলতের কথা বহু হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
 
যেমন ইবনে মাজার মধ্যে দুই ঈদের রাতের ফজিলতের ব্যাপারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাতে জাগ্রত থাকবে, সে ব্যক্তির হৃদয় ওই দিন মৃত্যুবরণ করবে না যেদিন অন্য হৃদয়গুলো মৃত্যুবরণ করবে।’ ইবনে মাজাহ। 

অর্থাৎ কিয়ামতের ভয়াবহ অবস্থার সময় প্রতিটি মানুষের অন্তর যখন ভীতসন্ত্রস্ত থাকবে এবং মানুষের হিতাহিত জ্ঞান বলতে কিছুই থাকবে না তখনো ঈদের রাতে ইবাদতকারীর অন্তর থাকবে নিশ্চিন্ত ও প্রফুল্ল। কারণ, সে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতের অধিবাসী হবে। কানজুল উম্মালের মধ্যে চার রাতের ফজিলতের ব্যাপারে রসুলুল্লাহ ব্যাপারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি চারটি রাত ইবাদতের উদ্দেশ্যে জাগ্রত থাকবে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। রাতগুলো হলো-জিলহাজ মাসের ৮ তারিখের রাত, আরাফার রাত, ঈদুল আজহার রাত এবং ঈদুল ফিতরের রাত।’ কানজুল উম্মাল। সুতরাং মুমিনের জীবনে উভয় ঈদের রাতের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই প্রত্যেক মুমিনের কর্তব্য হলো, ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার রাতে জাগ্রত থেকে নামাজ, তিলাওয়াত, জিকির-আসকার ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জন করা। দোয়া-ইসতিগফারের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করে কবরের আজাব ও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি চাওয়া। এবং উভয় রাতে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদানলাভের শ্রেষ্ঠ সুযোগ হাতছাড়া না করা। 

ঈদুল আজহার দিনের ফজিলত ও আমল : ঈদুল আজহার দিনে সবচেয়ে ফজিলতপূর্ণ আমল হচ্ছে কোরবানি করা। রসুলুল্লাহ ব্যাপারে রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘কোরবানির দিনে কোনো আদমসন্তানের কোরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করা থেকে আল্লাহর কাছে অধিক পছন্দনীয় কোনো আমল নেই। কিয়ামতের দিন কোরবানির পশু শিং, ক্ষুর, লোম প্রভৃতি নিয়ে উপস্থিত হবে। এবং তার রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহর নির্ধারিত মর্যাদার স্থানে পতিত হয়। অতএব, তোমরা প্রফুল্ল চিত্তে কোরবানি কর।’ ইবনে মাজাহ। 

ঈদুল আজহার নামাজের উদ্দেশ্যে গোসল করা, যথাসাধ্য পরিষ্কার ও সুন্দর পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করে ঈদগহে উচ্চৈঃস্বরে তাকবির পাঠ করতে করতে এক রাস্তা দিয়ে যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা সুন্নত। ঈদুল আজহার দিন না খেয়ে খালি পেটে ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়া সুন্নত। সম্ভব হলে ঈদের নামাজের পর দ্রুত কোরবানি সম্পন্ন করে কোরবানির গোশত দিয়েই ঈদের দিনের আহার শুরু করা মুস্তাহাব। কোরবানির গোস্ত তিন ভাগ করে এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বণ্টন করা মুস্তাহাব।

শাহ মাহমুদ হাসান
লেখক : ইসলাম বিষয়ক গবেষক।
মহান আল্লাহ মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদতের জন্য। আল্লাহ সুবহানাহুতায়ালা বলেছেন, ‘আমি জিন ও মানবজাতিকে একমাত্র আমারই ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছি।’ (সূরা জারিয়াত, আয়াত : ৫৬)। আল্লাহতায়ালার একান্ত ইচ্ছা তাঁর প্রত্যেক বান্দা তাঁর ইবাদত সম্পন্ন করার মাধ্যমে ইহ ও পরকালীন জীবনকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলবে। ইবাদত মূলত দুই প্রকার। ফরজ ইবাদত; যেমন- নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইত্যাদি। নফল ইবাদত; যেমন- নফল নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ, দান-খয়রাত, নফল রোজা রাখা ইত্যাদি।
মানব জাতি মূলত তখনই মহান আল্লাহতায়ালার কাছে প্রকৃত সম্মানিত ও প্রিয় হবে, যখন তার প্রতিটি কাজ হবে একমাত্র আল্লাহতায়ালারই উদ্দেশ্যে। সুখে-দুঃখে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে, তাঁকেই ভালোবাসবে। তাঁরই নৈকট্য লাভের চেষ্টায় সব সময় ব্যস্ত থাকবে। ফরজ ইবাদত সুসম্পন্ন করার সঙ্গে সঙ্গে নফল ইবাদতে অধিক মনোযোগী হবে। নফল ইবাদতগুলোর মধ্যে নফল রোজা বান্দাকে অতি সহজেই মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। কারণ, রোজা এমন একটি ইবাদত যা জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ঢালস্বরূপ এবং এর প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহতায়ালা নিজেই দিয়ে থাকেন বলে হাদিসে কুদসিতে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।

রমজান চলে যাওয়ার পরও বান্দা যেন সিয়াম সাধনা অব্যাহত রাখেন সে জন্য প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩ থেকে ১৫ তারিখের রোজা, আশুরার রোজা, ৯ জিলহজ আরাফার দিনের রোজা, ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এর রোজাসহ অন্যান্য নফল রোজার বিধান দিয়েছেন প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা.)। ফরজ নামাজের কমতিগুলো পূরণ করতে যেমন নফল নামাজ রয়েছে তেমনি ফরজ রোজার পরও শাওয়ালের সুন্নত রোজা রয়েছে রমজানের পূর্ণতা প্রদান করতে। রোজাদার যদি অনর্থক বাক্যালাপ, কুদৃষ্টি পাপাচার-কামাচার প্রভৃতি কাজ থেকে সম্পূর্ণ বাঁচতে না পারে, তাহলে তার রোজার সওয়াব কমে যায়। আর কমতির সওয়াব পূর্ণ করতেই শাওয়ালের ছয়টি রোজাসহ বছরজুড়েই রয়েছে নানা উপলক্ষে নফল রোজা। এই শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজার মাধ্যমে রমজানের রোজার শুকরিয়া আদায় করা হয়। যখন কোনো বান্দার আমল আল্লাহতায়ালা কবুল করেন তখন তাকে অন্য নেক আমলের তৌফিক দেন। সুতরাং এ রোজাগুলো রাখতে পারা রমজানের রোজা কবুল হওয়ার লক্ষণও বটে। রসুলুল্লাহ (সা.) নিজে এ রোজা রাখতেন এবং সাহাবায়ে কেরামদের রোজা রাখার নির্দেশ দিতেন। জলীলুল কদর সাহাবি হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।’ (মুসলিম শরিফ, হাদিস নং ৮২২)। এ হাদিসের ব্যাখায় মুহাদ্দিসগণ বলেন, রমজানের ৩০টি রোজার সঙ্গে শাওয়ালের ছয়টি রোজা যুক্ত হলে মোট রোজার সংখ্যা হয় ৩৬টি। আর প্রতিটি পুণ্যের জন্য ১০ গুণ পুরস্কারের কথা উল্লেখ রয়েছে কোরআনুল কারিমে। সূরা আনআমের ১৬০ নম্বর আয়াতে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি একটি সৎ কাজ করল সে ১০ গুণ সওয়াব পাবে।’ এ হিসাবে যে ব্যক্তি রমজানের এক মাস রোজা রাখল সে ১০ মাস রোজা রাখার সওয়াব পাবে। আর ছয়টি রোজার ১০ গুণ ৬০ দিন। অর্থাৎ দুই মাস। আর এ দুই মাস মিলে ১২ মাস রোজার সওয়াব। তাহলে ৩৬টি রোজার ১০ গুণ হলে ৩৬০টি রোজার সমান (এটি পুরস্কারের দিক থেকে)। অর্থাৎ সারা বছর রোজার সমান সওয়াব হবে।’
হজরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রমজানের রোজা ১০ মাসের রোজার সমতুল্য আর (শাওয়ালের) ছয় রোজা দুই মাসের রোজার সমান। সুতরাং এই হলো এক বছরের রোজা।’ (নাসায়ি শরিফ, ২য় খ-, পৃষ্ঠা. ১৬২)।
হজরত উবাইদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রসুলুল্লাহ, আমি কি সারা বছর রোজা রাখতে পারব?’ তখন রসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তোমার ওপর তোমার পরিবারের হক রয়েছে। কাজেই তুমি সারা বছর রোজা না রেখে রমজানের রোজা রাখ এবং রমজান-পরবর্তী শাওয়ালের ছয়টি রোজা রাখ, তাতেই সারা বছর রোজা রাখার সওয়াব পাবে। ’ (তিরমিজি শরিফ, খ-, ১ পৃ. ১৫৭)।
লেখক : এম ফিল গবেষক, মুফাসসিরে কোরআন, বেতার ও টিভির ইসলামী উপস্থাপক; খতিব, মণিপুর বাইতুর রওশন (মাইকওয়ালা) জামে মসজিদ, মিরপুর, ঢাকা।
জান্নাতুল বাকি সৌদি আরবের মদিনায় অবস্থিত একটি কবরস্থান। এটি মসজিদে নববীর দক্ষিণ পূর্ব দিকে অবস্থিত। পূর্বে এখানে কবরের উপর স্থাপনা ছিল। পরবর্তীতে সৌদি আরব সরকার তা ধ্বংস করে দেয়। এই কবরস্থানটি ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

মক্কা মুকাররমা’-এর কবরস্থান হলো, জান্নাতুল মুআল্লা। আর মদিনা মুনাওয়ারা’-এর কবরস্থান হলো-জান্নাতুল বাকি। এর মূল নাম হলো- ‘বাকিউল গারকাদ’। হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় থাকাবস্থায় হযরত উসমান ইবনে মযঊন (রা.) এর মৃত্যু হয়।
সাহাবায়ে কেরাম তখন হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, তাকে কোথায় দাফন করা হবে? হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করলেন, আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে, তাকে ‘বাকিউল গারকাদ’য় দাফন করা হবে। (মুসতাদরাকে হাকিম, খ.১১ পৃ.১৯৩)। এভাবেই এ জায়গা কবরস্থানের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়ে যায়। এবং এখানে সর্বপ্রথম (হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র দুধভাই) হযরত উসমান ইবনে মযঊন (রা.)-কে দাফন করা হয়।
তারপর কবরস্থান তিনদিকেই প্রশস্ত হতে থাকে। আর আজ তো তা বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তৃত। জান্নাতুল বাকি মসজিদে নববীর পূর্বদিকে অবস্থিত। প্রথমদিকে মদজিদে নববী আর বাকি মাঝখানে ‘হারতুত দাগওয়াত’ নামে একটি মহল্লা আবাদ ছিলো। যেখনে মদজিদে নববীর খাদেমরা তাদের বংশধর নিয়ে বসবাস করতেন। ১৪০৫ হিজরীতে মসজিদে নববী সংস্কারের সময় এই মহল্লাকে অন্য এক জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়। এখন এই জায়গা মসজিদে নববীর বারান্দা হিসেবেই ব্যবহার হয়। এবং এটার শেষ প্রান্তেই মসজিদে নববীর চার দেয়াল।
তারপর ‘আবু যর’ নামে একটা সড়ক। তারপর যথেষ্ট উচ্চতার পর জান্নাতুল বাকি। কবরস্থানের চতুর্দিকে একটি উঁচু প্রাচীর। পশ্চিম দিকে একটি বড় গেইট। কবরস্থানে যাওয়ার জন্য একটি প্রশস্ত সিঁড়ি। ফজরের পরে এবং আসরের পরে কবরস্থান সবার জিয়ারতের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বাহিরে পুলিশের লোকজন অবস্থান করে।
জান্নাতুল বাকি
ভেতরেও শক্তভাবে নজরদারি করা হয়, কোনোপ্রকার বেদাতি কাজ শুরু করলে, তা শক্তহাতে দমন করা হয়। মৃতদের দাফন করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ পাক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আদেশ দিচ্ছেন জান্নাতুল বাকির ফযিলত বোঝার জন্য এতটুকু তথ্যই যথেষ্ট। সর্বপ্রথম হুজুর সাল্লাল্লাহু আলালাইহি ওয়া সাল্লাম তার দুধ ভাইকে দাফন করেন।
তারপর তাঁর চাচি- হযরত ফাতেমা বিনতে আসাদ (হযরত আলী (রা.)-এর আম্মা) তারপর হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর ছেলে হযরত ইবরাহিম (রা.)-কে এখানে দাফন করা হয়। তাছাড়াও হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র তিন মেয়ে- হযরত রুকাইয়া (রা.), হযরত যয়নাব (রা.) এবং হযরত উম্মে কলসুম (রা.)-কে এখানে সমাহিত করা হয়।

এই তিন মেয়েই হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত থাকাবস্থায় ইন্তেকাল করেন। এর সামান্য সামনে উম্মুল মুমিনিন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.) এবং উম্মুল মুমিনিন হযরত মায়মূনা (রা.) ছাড়া বাকি সকল উম্মুল মুমিনিন’র কবর মোবারক। হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রা.) -এর ইন্তেকাল হয় মক্কায়। তাই তাকে জান্নাতুল মুআল্লায় দাফন করা হয়। উম্মুল মুমিনিন হযরত মায়মূনা (রা.)-এর ইন্তেকাল মক্কা থেকে ১০ মাইল দূরে “মাকামে সরফে’ হয়। সারাফ মদিনা দিকে আসতে যে সড়ক পাওয়া যায়, এর পাশেই।
এটা আশ্চর্যজনক যে, হযরত মায়মূনা (রা.)-এর বিবাহও এই জায়গায় হয়। এবং মৃত্যুও এই জায়গায়। এবং এখনেই তার মাকবারা। উম্মাহাতুল মুমিনিন’র মধ্য থেকে শুধু উম্মুল মুমিনিন হযরত যয়নাব বিনিতে খুযাইমা রা.-এর মৃত্যু হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’এর জীবদ্দশায় ঘটে। এবং হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে তাকে দাফন করেন। বাকি উম্মাহাতুল মুমিনিনরা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র বিদায়ের পর মৃর্ত্যুবরণ করেন। এবং তাদের সকলকে জান্নাতুল বাকিতে দাফন করা হয়।

যদি সামান্য বামদিকে যান, তাহলে ছোট একটি অংশ নজরে আসবে, এখানে হযরত আলী (রা.)-এর ভাই হযরত আকিল এবং তার ভাতিজে আবদুল্লাহ ইবনে জাফর তৈয়্যার (রা.)’ এর কবর। এর বরাবর একটি শারী। এবং শুরতেই হযরত নাফে রা. এবং হযরত ইমাম মালিক রহ.-এর কবর। এর সোজা বরাবর সামনে বেড়ে আরো কিছু কদম পরে, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র সাহেবজাদা হযরত ইবিরাহিম (রা.) এর কবর।
এবং এর কিছুটা দূরে হযরত ওসমান (রা.)-এর কবর। এবং এর বিপরীত দিকে হযরত হালিমা সা’দিয়া (রা.) এর কবর। এর মধ্যখানে আরেকটি বেড়া রয়েছে যে পাশটায় শুহাদাদের দাফন করা হয়েছে। দরজা দিয়ে প্রবেশ করে ডান দিকে দেয়ালের বিলকুল নিচে ইসমাঈল ইবনে জাফরের মাযার। এবং বামদিকে হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’র ফুফুর কবর। এই পুরো কবরস্থানেই বড় বড় হাস্তিদের কবর মোবারক। এখন আর সেখানে দাফন হয় না।
হ্যা অবশ্যই সৌদি সরকার এখন এটাকে উত্তর-পশ্চিম দিকে যথেষ্ট প্রশস্ত করছে। এখানে সাধারণ সব মুসলমানদের দাফন করা হয়। এর বেশিরভাগই হাজি। মূলত তারাই তো সৌভাগ্যবান, যারা মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। সৌদি সরকার দু’বার বাকিকে সংস্কার করেছে। প্রথম সংস্কার করে শাহ ফয়সাল ইবনে আবদুল আজিজের আমলে।

এসময় ‘বাকিউল গামাত’ এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত একটি সড়ককে বাকির সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। উত্তর দিক থেকেও এক অংশকে বাকির সঙ্গে প্রশস্ততায় যুক্ত করা হয়। সর্বমোট ছয় হাজার মিটার সংযোগ করা হয়। তাছাড়া বাকির ভেতরে পাকা রাস্তা বানানো হয়। যাতেকরে বৃষ্টির মৌসুমে দর্শনার্থী এবং দাফন করতে আসা লোকদের কোনধরনের কষ্ট না হয়।
দ্বিতীয় দফা সংস্কার হয়, শাহ ফাহাদ’র আমলে। এবং সময় আশপাশের সকল মহল্লা, বাজার, সড়ক উচ্ছেদ করে জান্নাতুল বাকিতে সংযুক্ত করে জান্নাতুল বাকিকে প্রশস্ত করা হয়। এখন জান্নাতুল বাকির চতুর্দিকে সতেরশো চব্বিশ মিটার লম্বা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। এবং এতে মরমর পাথর লাগানো হয়েছে। এবং দেয়ালে কালো রঙ্গের লোহার জালি লাগানো হয়েছে। জান্নাতুল বাকির একপাশে মৃতের গোসল দেয়া এবং কাফন পরানোরও ব্যবস্থাপনা করা হয়েছে।
জান্নাতুল বাকি’র ফযিলত সম্পর্কীয় হাদিস অনেক। এই কবরস্থানের সবচেয়ে বড় ফযিলত হলো- হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাত্রিবেলা ঘুম থেকে উঠে এখানে চলে আসতেন। এবং এই কবরস্থান’য় শায়িত লোকদের মাগফিরাত’র জন্য দোআ করতেন।

হযরত আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত লম্বা একটি হাদিসে একটি ঘটনা হলো-
‘একদিন রাসুল (সা.) (বণ্টনানুযায়ী আমার নির্ধারিত দিনে) পাশে ছিলেন। কিছুক্ষণ থাকার পর যখন দেখলেন আমার চোখের পাতা বুজে গেছে। তিনি আস্তে আস্তে উঠলেন এবং সাবধানতার সঙ্গে দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে গেলেন। তারপর আবার শান্তশিষ্টভাবে দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমি উঠে কাপড় পরিবর্তন করলাম। এবং চাদর গায়ে দিয়ে তার পিছু পিছু চলতে শুরু করলাম। তিনি জান্নাতুল বাকিতে প্রবেশ করে একটি জায়গায় দাঁড়ালেন। প্রায় অনেকক্ষণ যাবত তিনি সেখানে দাঁড়িয়েই থাকলেন।তিনবার হাত উঠিয়ে দু’আ করলেন। তারপর মুখ ঘুরালেন। আমিও মুখ ফিরালাম এবং খুব দ্রুত গতিতে বরং বলা যায়, দৌঁড়ে দৌঁড়ে এসে ঘরে প্রবেশ করলাম। তারপর ঠিকঠাকভাবে আগের মতো আস্তে করে শুয়ে পড়লাম। আমি ঘরে পৌঁছুতে না পৌঁছতে দেখি, তিনিও ঘরে পৌঁছে গেছেন। এসে বলতে লাগলেন, আয়েশা! তোমার কি হলো?
তোমার শ্বাস যে ফুপে উঠছে। বললাম, না কিছুই না। বললেন, নিজে বলে দাও, নয়তো আমার সুক্ষ্ম সংবাদদাতা (আল্লাহ) আমায় সব বলে দেবেন। বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! আমার পিতা-মাতা আপনার উপর উৎসর্গ হোক! ঘটনা হলো, এই…। বললেন, আচ্ছা! ওই ছাঁয়া তাহলে তোমার ছিলো? যেটা আমি ওখানে দেখছিলাম। বললাম, জি হ্যা! বললেন, তোমার সংশয় ছিলো, আল্লাহ এবং তার রাসুল তোমার উপর জুলুম করবেন। বললাম, লোক যতোই লুকোচুরি করুক না ক্যান। আল্লাহ তো জেনেই ফেলেন।
তারপর তিনি আমাকে বললেন, কথা হলো, হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম আমার কাছে আসছিলেন। তিনি আমাকে আস্তে আস্তে ডাকছিলেন, যাতে তুমি বুঝতে না পারো। তিনি ভেতরে আসতে পারছিলেন না, কেননা, তখন তোমার কাপড় এলোমেলো ছিলো। আমিও ভাবলাম তুমি শুয়ে আছো। এজন্য আমি তোমাকে আর জাগানোও সমীচীন মনে করিনি।
আমার এটাও ভয় ছিলো, তুমি একা এখানে ভয় পাবে। জিবরাইল আলাইহিস সালাম, আমাকে বলতে লাগলেন, আপনার রব আপনাকে হুকুম করছেন, আপনি (জান্নাতুল) বাকিবাসীদের কাছে যাবেন। এবং তাদের জন্য মাগফিরাত’র দু’আ করবেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নং-৯৭৩)

হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার বণ্টিত নির্ধারিত দিন আমার কাছে থাকাবস্থায় রাতের প্রায় শেষাংশে উঠে বাকিতে চলে যেতেন। এবং বলতেন-
‘হে মুমিন শহরবাসীরা! তোমাদের ওপর সালাম বর্ষিত হোক। কালই তোমরা তোমাদের প্রতিশ্রুত বস্তু পাচ্ছো। তোমরা (কিয়ামতের জন্য) বিলম্ব করছ। ইনশাআল্লাহ! আমরাও অচিরেই তোমাদের সঙ্গে মিলিত হচ্ছি। হে আল্লাহ! কাকিবাসীকে মাফ করে দাও।’
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন- ‘কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির জমিন চিড় ধরবে, সে ব্যক্তি আমি। তারপর আবু বকর (রা.), তারপর ওমর (রা.), তারপর আহলে বাকি। আমি আহলে বাকি’র পাশে আসবো। তারা আমার সঙ্গে একত্র হবে। তারপর আমি মক্কাবাসীর অপেক্ষা করবো। তারা মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি জায়গায় এসে আমার সঙ্গে মিলিত হবে। (সুনানে তিরিমযি, হাদিস নং-৩৬২৫; মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং-৩৬৯১)

হযরত উম্মে কায়েস বিনতে মুহসিন হতে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘ কিয়ামতের দিন সত্তরহাজার লোক কবর থেকে এমনভাবে উঠবে যে, তাদের চেহারা চতুর্দশ রাত্রির পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায় চমকাতে থাকবে। এবং এই সকল লোক কোনো হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, হাদিস নং-৭০৩৫)
 লেখক : নাজমুল ইসলাম কাসিমী
স্ক্যান্ডেনেভিয়া অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশে দিন বড়, রাত খুবই ছোট। আবার কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টাই দিন থাকে। পৃথিবীর এসব অঞ্চলে বসবাসরত মুসলিমরা রোজা কিভাবে পালন করেন, এ প্রশ্ন মনে জাগতেই পারে। 
নরওয়ে, আইসল্যান্ডের মুসলমানরা রোজা রাখা নিয়ে খুব সমস্যার মুখোমুখী। এই অঞ্চলটিতে এমন কিছু জায়গা আছে যেখানে বছরের এই সময়টাতে সূর্যই অস্ত যায় না। আর্কটিক সাগরে নরওয়ের এসভালবার্ড দ্বীপমালা তেমনি একটি অঞ্চল। এপ্রিল থেকে আগস্ট- বছরের এই সময়টাতে ২৪ ঘণ্টাই দিন থাকে সেখানে। এছাড়া নরওয়ের মূল ভূখণ্ডের ট্রোমসো শহরের অবস্থাও একই।
এই রকম অঞ্চল যেখানে রাতই হয় না, তারা কিভাবে রোজা রাখবেন। কিভাবে সেহেরী ও ইফতার করবেন বিষয়টি নিয়ে সৃষ্টি হয়েছে অনিশ্চয়তা। তবে তাদের জন্য তিনটি অপশন রয়েছে বলে জানিয়েছেন নরওয়ের রাজধানী অসলোর একটি মসজিদের ইমাম ও মুসলিম স্কলার অসিম মোহাম্মাদ। 
এদিকে চলতি রমজানের মধ্যেই নতুন একটি চাকরিতে যোগদান করবেন ৩৪ বছর বয়সী নওমুসলিম নারী সোফি ক্লাউজার দার। ডেনমার্কের এই বাসিন্দা চিন্তায় আছেন কিভাবে নতুন চাকরিতে গিয়ে ১৭ ঘণ্টা রোজা পালন করবেন। স্ক্যান্ডেনেভিয়া অঞ্চলের দেশটিতে এখন ১৭ ঘণ্টা লম্বা দিন হয়। এত দীর্ঘ সময় রোজা রাখতে হয় ডেনিশ মুসলমানদের।
একটি বেবি কেয়ার সেন্টারে চাকরি শুরু করবেন সোফি। নওমুসলিম এই নারীকে সেখানে বাচ্চাদের দেখাশোনার কাজ করতে হবে। দেশটিতে রাত এতই ছোট এখন যে রাতের কাজগুলো ঠিক মতো করাও কষ্টকর। 
সোফি বলেন, রাতের খাবার ও সেহেরী খাওয়া, মাগরিব, এশা ও তারাবির নামাজ- এতসব কাজের জন্য রাত খুবই ছোট। সময় দ্রুতই শেষ হয়ে যায় এখানে। রাতে ঘুমানোর সময়ই পাওয়া যায় না।
গরমে দীর্ঘক্ষণ রোজ রাখতে গিয়ে অনেকেই পানিশূন্যতা, ক্লান্তিসহ অনেকভাবে অসুস্থ বোধ করতে পারেন। এই পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে সোফি দার বলেন, রাত এত ছোট যে পরের দিন রোজা রেখে সুস্থ্য থাকার মতো পর্যাপ্ত পানি ও খাবার গ্রহণ করা হয় না। যে কারণে রোজা রাখা সত্যিই কঠিন। রাত ছোট হওয়ার কারণে ঘুম হয় না বললেই চলে সেটিও রোজাদারদের জন্য কষ্টকর। ধরুন আমার বাচ্চাকে সকাল আটটায় স্কুলে দিয়ে আসতে হয় কাজেই বিষয়টি কঠিন। তবে কয়েকদিন গেলে তখন রোজার একই কষ্টে অভ্যস্ত হয়ে যান বলে জানান এই মুসলিম নারী। তখন আর কষ্ট অনুভব হয়না।
 
ইমাম ও মুসলিম স্কলার অসিম মোহাম্মাদ বলেন, যে অঞ্চলে সূর্য ডোবেই না, তারা হয়তো নিকটস্থ শহরের সূর্যদয় ও সূর্যাস্ত দেখে রোজা রাখা ও ইফতার করতে পারেন। কিংবা মুসলিমদের কেবলার নগরী মক্কার সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অথবা তাদের এলাকায় কিছুদিন আগে যখন সূর্যাস্ত হত সেই সময় হিসাব করে করতে পারেন।
এই ইমাম জানান, তার আশাপাশের অনেকেই রমজান মাসে চাকরি থেকে ছুটি নেয়ার চিন্তা করছেন। কারণ ১৭ ঘণ্টার বেশি রোজা রেখে চাকরি করা কঠিন। তিনি বলেন, অবশ্য চাকরিতে কাজের ধরনের ওপর এটি অনেকটা নির্ভরশীল। যারা অফিসের অভ্যন্তরে ডেক্স জব করে, এয়ার কন্ডিশনারের ভেতর তাদের খুব একটা সমস্যা হয় না। তবে যারা এই গরম আবহাওয়ায় বাইরে কাজ করেন তাদের জন্য কঠিন।
 
নরওয়েতে গ্রীষ্ম কিংবা বসন্তের দিকে দিন বড় হয়; কিন্তু শীতে এই চিত্রটা একদমই উল্টো। তাই যখন শীতে রোজ হয় তখন তাদের জন্যে সেটি খুবই সহজ হয়ে যায়। ইমাম মোহাম্মদ বলেন, নরওয়েতে গ্রীষ্ম ও শীতে দিন-রাতের মধ্যে অনেক বেশি পার্থক্য। ডিসেম্বরের শীতে সোয়া তিনটার মধ্যেই সূর্য ডোবে। যে কারণে শীতে রোজা রাখতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করে সবাই।
মানসিক অবসাদ দূর করতে হাদীস শরীফে একটি খাবারের কথা বলা হয়েছে। যা শতভাগ কার্যকরী টোনিক হিসেবে হাদিসে বর্ণনা করা হয়েছে।
হাদিস শরীফে এসেছে, হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর পরিবারের লোকেদের জ্বর হলে, তিনি দুধ ও ময়দা সহযোগে তরল পথ্য তৈরি করার নির্দেশ দিতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মনে শক্তি যোগায় এবং রোগীর মনের ক্লেশ ও দুঃখ দূর করে, যেমন তোমাদের কোন নারী পানি দ্বারা তার চেহারার ময়লা দূর করে। সহীহুল বুখারী ৫৪১৭, মুসলিম ২২১৬, তিরমিযী ২০৩৯, ১/৩৪৪৫।
অন্য এক হাদীসে এসেছে, আয়েশা (রা.) বলেন, হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, অপ্রিয় কিন্তু উপকারী বস্ত্তটি তোমরা অবশ্যই গ্রহণ করবে। তা হলো তালবীনা অর্থাৎ হাসা ( দুধ ও ময়দা সহযোগে প্রস্ত্তত তরল পথ্য)। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসা-এর পাতিল চুলার উপর থাকতো, যাবত না রোগী সুস্থ হতো অথবা মারা যেতো। ২/৩৪৪৬। সহীহুল বুখারী ৫৪১৭, মুসলিম ২২১৬, তিরমিযি ২০৩৯, আহমাদ ২৩৯৯১, ২৪৬৯৩, ২৫৫১৯
এই পৃথিবীতে ঐ সকল মানুষই সুভাগ্যবান যাদের জন্য আসমানে দোয়া করা হয়। অর্থাৎ ফেরেশতারা দোয়া করেন। আর ফেরেশতারা হচ্ছে নিষ্পাপ, যারা সব সময় আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকে। আল্লাহ তাদেরকে বিশেষ ভাবে তৈরি করেছেন এবং বিশেষ কিছু ক্ষমতার অধিকারী করেও তাঁদেরকে বানিয়েছেন। ৭ শ্রেণীর মানুষের জন্য ফেরেশতারা দোয়া করেন:
১. ওযূ অবস্থায় ঘুমানো ব্যক্তি
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় (ওজূ অবস্থায়) ঘুমায় তার সাথে একজন ফেরেশতা নিয়োজিত থাকেন। অতঃপর সে ব্যক্তি ঘুম থেকে জাগ্রত হওয়ার সাথেই আল্লাহ তাআলার সমীপে ওই ফেরেশতা প্রার্থনায় বলে থাকেন, হে আল্লাহ! তোমার অমুক বান্দাকে ক্ষমা করে দাও, কেননা সে পবিত্রাবস্থায় ঘুমিয়েছিল।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান)
২. নামাজের জন্য মসজিদে অপেক্ষারত ব্যক্তি
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মাঝে কোনো ব্যক্তি যখন ওযূ অবস্থায় সালাতের অপেক্ষায় বসে থাকে সে যেন সালাতেই রত। তার জন্য ফেরেশতারা দোয়া করতে থাকে, হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করো, হে আল্লাহ! তুমি তার প্রতি দয়া করো।’ (সহীহ মুসলিম ৬১৯)
৩. প্রথম কাতারে সালাত আদায়কারী
হযরত বারা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল (সা.) বলতেন, ‘প্রথম কাতারের নামাযীদেরকে নিশ্চয়ই আল্লাহতালা ক্ষমা করেন ও ফেরেশতারা তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান)
৪. রাসূল (সা.) এর প্রতি দুরূদ পাঠকারী
‘যে ব্যক্তি রাসূল (সা.)এর উপর দুরূদ পাঠ করবে আল্লাহতালা তার ওপর সত্তর বার দয়া করেন ও তার ফেরেশতারা তার জন্য সত্তরবার ক্ষমা প্রার্থনা করবে। অতএব বান্দারা অল্প দুরূদ পাঠ করুক বা অধিক দুরূদ পাঠ করুক (এটা তার ব্যাপার)।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান)
৫. যে ব্যাক্তি রোগী দেখতে যায়
রাসূল (সা.) বলেছেন, যে কোনো মুসলিম তার অপর (অসুস্থ) মুসলিম ভাইকে দেখতে যায়, আল্লাহতালা তার জন্য সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রেরণ করেন, তারা দিনের যে সময় সে দেখতে যায় সে সময় থেকে দিনের শেষ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে এবং সে রাতের যে সময় দেখতে যায় সে সময় থেকে রাতের শেষ পর্যন্ত তার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে।’ (সহীহ ইবনে হিব্বান, ২৯৫৮)
৬. মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়াকারী
রাসূল (সা.) বলেছেন, কোনো মুসলিম তার অনুপস্থিত ভাইয়ের জন্য দোয়া করলে তা কবুল করা হয় এবং তার মাথার কাছে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত থাকে। যখনই সে ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য কল্যাণের দোয়া করে তখন সে নিযুক্ত ফেরেশতা বলে, আমীন অর্থাৎ হে আল্লাহ! কবুল করুন এবং তোমার জন্য অনুরূপ অর্থাৎ তোমার ভাইয়ের জন্য যা চাইলে আল্লাহ তোমাকেও তাই দান করুন। (সহীহ মুসলিম ৮৮)
৭. কল্যাণের পথে দানকারী
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন, একজন বলেন, হে আল্লাহ! দানকারীর সম্পদ বাড়িয়ে দাও। আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! যে দান করে না তার সম্পদকে বিনাশ করে দাও।’ (বুখারী ১৪৪২)
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনই হয়েছিল বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে। তিনি সর্বদা উম্মতের কল্যাণ চিন্তায় থাকতেন। তার বর্ণিত হাদিসগুলো কেয়ামত পর্যন্ত উম্মতকে পথের দিশা দেখিয়ে যাবে।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশাল হাদিসে ভাণ্ডার থেকে চয়ন করে উম্মতের জন্য বিশেষ ১১টি উপদেশ এখানে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। ওই সব উপদেশ মালায় হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

১. যদি পরিপূর্ণ ঈমানওয়ালা হতে চাও, তবে উত্তম চরিত্র অর্জন করো।
২. যদি সবচেয়ে বড় আলেম বা জ্ঞানী হতে চাও, তবে তাকওয়া (আল্লাহ ভীতি) অর্জন করো।
৩. যদি সবচেয়ে বেশি সম্মান পেতে চাও, তবে মানুষের নিকট হাত পাতা (অন্যের ওপর ভরসা করা, ভিক্ষা করা) বন্ধ করে দাও।
৪. যদি আল্লাহর নিকট বিশেষ সম্মান পেতে চাও, তবে অধিক পরিমাণে আল্লাহর জিকির করো।
৫. যদি রিজিকের প্রশস্ততা চাও, তবে সর্বদা অজুর সঙ্গে থাকার চেষ্টা করবে।
৬. যদি সমস্ত দোয়া কবুল হওয়ার আশা রাখো, তবে অবশ্যই হারাম থেকে বেঁচে থাকবে।
৭. যদি কেয়ামতের দিন আল্লাহর দরবারে গুনাহমুক্ত উঠতে চাও, তবে সহবাসের পর দ্রুত পবিত্র হয়ে যাবে।
৮. যদি কেয়ামতের দিন আল্লাহর নূর নিয়ে উঠতে চাও, তবে মানুষের ওপর জুলুম
করা ছেড়ে দাও।
৯. যদি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চাও, তবে আল্লাহর ফরজ বিষয়াদির প্রতি যত্নবান হও।
১০. যদি জাহান্নামের আগুন নেভাতে চাও, তবে দুনিয়ার বিপদাপদে সবর করো।
১১. যদি আল্লাহতায়ালার রাগ বা গোস্বা থেকে বাঁচতে চাও, তবে গোপনে সদকা করো, আত্নীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে চলো এবং মানুষের ওপর রাগ করা ছেড়ে দাও
আল্লাহতায়ালা সবাইকে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এসব উপদেশ মেনে চলার তওফিক দান করুন। আমিন
স্বামীর ওপর স্ত্রীর অধিকার ও স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এবার ভিন্ন একটি বিষয় আলোচনার প্রয়োজন বোধ করছি। বর্তমান সমাজে স্বামী স্ত্রী উভয় চাকুরি করে থাকেন। নারীদের কর্মক্ষেত্রে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সে হিসেবে অনেক বিবাহিত নারীও চাকুরি করেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে সংসারে স্ত্রীও চাকুরি করেন তার উপার্জনে কী স্বামীর কোনো অধিকার রয়েছে কীনা বা সংসার খরচের জন্য ব্যয় করা বাধ্যতামূলক কীনা।
ইসলামি শরিয়া মতে, স্বামীর উপার্জনের ওপর স্ত্রীর ভরণ পোষণের অধিকার থাকলেও স্ত্রীর উপার্জনের ওপর স্বামীর কোনো অধিকার নেই। সংসারে স্ত্রীর উপার্জন থেকে ব্যয় করার জন্য তাকে বাধ্য করা যাবে না। তবে খুশি মনে যদি স্ত্রী সংসারের জন্য ব্যয় করেন এটা তার জন্য সদকায়ে জারিয়া হিসেবে গণ্য হবে। তবে কোনো ক্রমেই তাকে বাধ্য করা যাবে না। খুশি মনে ব্যয় করলে ভিন্ন বিষয়।
স্ত্রীর উপার্জিত অর্থ তার অনুমতি ব্যতীত খরচ করা, কিংবা স্ত্রীকে না জানিয়ে মা-বাবা, ভাই-বোন থেকে শুরু করে কাউকে ওই টাকা দিয়ে সাহায্য করা ইসলাম অনুমোদন দেয় না। এটা জায়েজ নেই। এটা করলে স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করা হবে এবং তার আমানতের খেয়ানত করা হবে।
স্ত্রীর উপার্জিত টাকা থেকে পারিবারিক ঋণ পরিশোধ অথবা সংসার পরিচালনার জন্য খরচ করতে হলে অবশ্যই স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তার অনুমতি হলেই কেবল এটাই সম্ভব হবে, অন্যথায়। কারণ, স্ত্রীর সম্পদের অধিকারী স্বামী নয়। তাই স্ত্রীকে না জানিয়ে তার খরচ করলে স্বামী গুনাহগার হবে।
তবে হ্যাঁ, স্বামী তার উপার্জিত টাকা সংসারের চাহিদা মিটিয়ে নিজ পছন্দমতো খরচ করতে পারবে। এ ক্ষেত্রে স্ত্রীর অনুমতি নেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। তবে স্ত্রীর উপার্জিত অর্থে স্বামীর অধিকার না থাকলেও প্রয়োজনে স্বামীর সংসারের জন্য খরচ করা পুণ্যের কাজ। এতে স্বামী স্ত্রীর মাঝে মিল মুহাব্বত ভালবাসা বৃদ্ধি পাবে। একে অপরের প্রতি সহনশীল হবে। স্ত্রীর স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করেই তার অর্থ ব্যয় করা উচিত। এতে স্বামীর মনও খুশি থাকবে। তবে স্ত্রী যদি তার অর্থের ব্যাপারে স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ নাও করেন এর জন্য স্ত্রীকে দোষারোপ করা যাবে না।
প্রিয়নবী (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের বরকতময় স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র শহর মদিনা। এই পুণ্যভূমিতেই সবুজ গম্বুজের ছায়ায় চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ মানব, সায়্যিদুল মুরসালিন, রাহমাতুল্লিল আলামিন (সা.)।
তাঁর পবিত্র দেহ বুকে ধারণ করে মদিনা চিরধন্য। তাঁর নাম শোনামাত্রই হৃদয়ের আয়নায় ভেসে ওঠে এক স্বর্গীয় নগরীর ছবি। প্রেম, ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধে ভরে যায় মন। মুমিনের জীবনে আল্লাহর ঘর জিয়ারত ও প্রিয় হাবিবের রওজার পাশে দাঁড়িয়ে সালাম জানানোর চেয়ে বড় কোনো প্রাপ্তি হতে পারে না। মুসলমানদের প্রাণের মদিনা সম্পর্কে জেনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ নানা তথ্য।
মদিনার মর্যাদা
মদিনা বরকতপূর্ণ নগরী। এর বরকতের জন্য প্রিয়নবী (সা.) আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন, ‘হে আল্লাহ! আপনি মক্কায় যে বরকত দান করেছেন, তার দ্বিগুণ বরকত মদিনায় দান করুন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৩৩৯২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমাকে এমন এক নগরীতে বসবাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যা মর্যাদায় সব শহরকে ছাড়িয়ে যাবে। মানুষ তাকে ইয়াসরিব বলে। তার নাম হলো মদিনা। তা মন্দ চরিত্রের লোকদের এমনভাবে দূর করে দেবে, যেমন কামারের ভাট্টি লোহার ময়লা দূর করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৭১)
মদিনার প্রতি রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসা
আয়েশা (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! তুমি মদিনাকে আমাদের কাছে এমনই প্রিয় করে দাও, যেমনি প্রিয় করেছ মক্কাকে। বরং তার চেয়েও বেশি প্রিয় করে দাও।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৩৭২)
আনাস (রা.) সূত্রে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোনো সফর থেকে মদিনায় ফিরে আসতেন, তখন দূর থেকে মদিনার ঘরবাড়ি দেখেই তাঁর উটের গতি বাড়িয়ে দিতেন। অন্য কিছুতে আরোহিত থাকা অবস্থায় ভালোবাসার আতিশয্যে তা নাড়াচাড়া শুরু করে দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৮৬)
আবু হুমাইদ সায়েদি (রা.) বলেন, “আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে আসছিলাম। যখন আমরা মদিনার নিকটবর্তী হলাম, রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘এই তো পবিত্র ভূমি। এই তো ওহুদ পাহাড়, যে পাহাড় আমাদের ভালোবাসে, আমরাও তাকে ভালোবাসি’।” (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৪২২)
মদিনাবাসীর ফজিলত
মদিনাবাসী আনসার সাহাবিদের সম্পর্কে আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘আর ওই সব লোক, যারা তাতে (মদিনায়) আগে থেকেই ইমানের সঙ্গে বসবাস করছে। যারা হিজরত করে তাদের কাছে আসে, তাদের তারা ভালোবাসে। আর যা কিছু তাদের (মুহাজিরদের) দেওয়া হয়, তার জন্য নিজেদের অন্তরে কোনো চাহিদা বোধ করে না। আর তাদের (মুহাজিরদের) তারা নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়, যদিও তারা অভাব-অনটনে ভোগে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মদিনার অধিবাসীদের কোনো ক্ষতি সাধন করতে চায়, আল্লাহ তাকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন, যেভাবে লবণ পানির মধ্যে মিশে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৩৮৬)
মদিনা ইমান ও নিরাপত্তার স্থান
মদিনা থেকেই ইমানের আলো সারা বিশ্বে বিচ্ছুরিত হয়েছিল। শেষ যুগে মানুষ যখন ইমান থেকে বিচ্যুত হতে থাকবে, তখন ইমান তার গৃহে তথা মদিনার দিকে ফিরে আসবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইমান মদিনার দিকে ফিরে আসবে, যেভাবে সাপ তার গর্তের দিকে ফিরে আসে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৭৬) দাজ্জালের আবির্ভাবে ফিতনা যখন বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়বে, পৃথিবীবাসী ভীত থাকবে। পৃথিবীর সর্বত্র বিচরণ করতে সক্ষম হলেও তখন সে পবিত্র মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না। হাদিস শরিফে আছে, ‘মক্কা ও মদিনা ছাড়া এমন কোনো শহর নেই, যা দাজ্জালের পদার্পণে বিপর্যস্ত হবে না। মক্কা-মদিনার প্রতিটি ফটকেই ফেরেশতারা সারিবদ্ধ হয়ে পাহারা দেবেন। তখন মদিনা তার অধিবাসীদেরসহ তিনবার কেঁপে উঠবে। আর সব কাফির ও মুনাফিক মদিনা ছেড়ে চলে যাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৮১)
মদিনায় মসজিদে নববী
মদিনার মসজিদের রয়েছে সবিশেষ গুরুত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমার এই মসজিদে নামাজ আদায় মক্কার মসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য সব মসজিদে নামাজ অপেক্ষা এক হাজার গুণ বেশি সাওয়াব।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৯০)
আরেক বর্ণনায় রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার এই মসজিদে লাগাতার ৪০ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেছে, এর মধ্যে কোনো নামাজ ছোটেনি, সে মোনাফেকি ও দোজখের আজাব থেকে নাজাত পাবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১২৫৮৩)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেন, ‘আমার মিম্বার ও ঘরের মাঝখানের অংশটুকু জান্নাতের বাগিচাসমূহের একটি বাগিচা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৯৫)
মসজিদে নববীর পাশে আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় অবস্থিত নবীজির রওজা শরিফ। তারই পাশে হজরত আবু বকর (রা.) ও উমর (রা.)-এর কবর। এর পাশে আরেকটি কবরের জায়গা খালি আছে, এখানে হজরত ঈসা (আ.)-এর সমাধি হবে। (তিরমিজি, হাদিস : ৩৬১৭)
রওজা শরিফের পশ্চিম দিকে রাসুল (সা.)-এর মিম্বার পর্যন্ত স্থানটুকুকে ‘রিয়াজুল জান্নাত’ বা বেহেশতের বাগিচা বলা হয়। এটি দুনিয়ায় একমাত্র জান্নাতের অংশ।
মসজিদে নববীর পূর্ব দিকে অবস্থিত ‘জান্নাতুল বাকি’ গোরস্তানে অসংখ্য সাহাবা, তাবেইন, আউলিয়া ও নেককার মুসলমানের কবর রয়েছে। এর মধ্যে হজরত উসমান, আলী, ইবনে মাসউদ, ফাতিমা, আয়েশা, রাসুল (সা.)-এর দুধমা হালিমা, চাচা আব্বাস, রাসুল (সা.)-এর ছেলে ইব্রাহিম, হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুমসহ অনেকের কবর আছে। রাসুল (সা.) প্রায়ই জান্নাতুল বাকিতে জিয়ারতে যেতেন।
পবিত্র রওজা জিয়ারত
মদিনা শরিফ যাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্যই হবে রওজাপাকের জিয়ারত। হাদিস ও ফিকাহ গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়ে নির্দেশনা রয়েছে। মদিনায় যাওয়া নিছক কোনো ভ্রমণ নয়, বরং তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। আর তা হতে হবে রওজাপাকের জিয়ারতের নিয়তেই। আল্লামা সামহুদি (রহ.) বলেন, ওহুদের শহীদদের কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে নবী করিম (সা.) তাশরিফ নিয়েছেন। দুনিয়ার সব কবরের মধ্যে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে বেশি জিয়ারতের উপযুক্ত স্থান হলো রাসুল (সা.)-এর রওজা। তাই এর উদ্দেশে সফর করাও উত্তম। এ কথার ওপর পূর্বাপর সব উলামায়ে কেরামের ঐকমত্য রয়েছে। (ওয়াফাউল ওয়াফা : ৪/১৮৮)
হাদিস শরিফে রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার কবর জিয়ারত করল, তার জন্য আমার সুপারিশ অবধারিত।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস : ২৬৯৫, শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩৮৬২) হাদিসটিকে ইমাম ইবনুস সাকান, আব্দুল হক ও তাকি উদ্দিন সুবকি (রহ.) সহিহ বলেছেন। (নায়লুল আওতার : ৫/৯৫) অন্য হাদিসে রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি একমাত্র আমার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে এবং এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই আমার জিয়ারতে আসবে, কিয়ামতের দিন তার সুপারিশ করা আমার ওপর জরুরি হয়ে পড়বে।’ (আল মুজামুল কাবির : হাদিস : ১৩১৪৯) হাদিসটিকে ইমাম ইবনুস সাকান ও ইরাকি (রহ.) সহিহ বলেছেন। (ওয়াফাউল ওয়াফা : ৪/১৭১, এলাউস সুনান : ৭/৩৬০৬)
অন্য হাদিসে রয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার মৃত্যুর পর আমার জিয়ারত করবে, সে যেন আমার জীবদ্দশায়ই আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করল।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস : ২৬৯৪, শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩৮৫৫) ইমাম জাহাবি রহ.-এর মতে, হাদিসটির সূত্র ভালো (জাইয়্যেদ)। (ওয়াফাউল ওয়াফা : ৪/১৭১)
মদিনায় মৃত্যুর ফজিলত
প্রিয় নবী (সা.) তাঁর উম্মতকে মদিনায় আবাসস্থল বানাতে এবং এর মধ্যে মৃত্যু কামনা করতেও উৎসাহ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘যে ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে আমার কবর জিয়ারত করবে, কিয়ামতের দিন সে আমার পাশে থাকবে। আর যে মদিনায় বসবাস করবে এবং তার বিপদাপদের ওপর ধৈর্য ধারণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার সাক্ষী ও সুপারিশকারী হব। আর যে ব্যক্তি দুই পবিত্র নগরীর (মক্কা-মদিনা) যেকোনো একটিতে মৃত্যুবরণ করবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে নিশ্চিন্ত করে ওঠাবেন।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩৮৫৬)
অন্য হাদিসে এসেছে : ‘তোমাদের মধ্যে যার পক্ষে সম্ভব হয়, সে যেন মদিনায় মৃত্যুবরণ করে। কেননা যে ব্যক্তি মদিনায় মৃত্যুবরণ করবে, আমি তার জন্য সুপারিশ করব।’ (তিরমিজি, হাদিস : ৩৯১৭)
আল্লাহ তাআলা আমাদের রাসুল (সা.)-এর রওজাপাক জিয়ারত ও মদিনায় মৃত্যু নসিব করুন। আমিন।
                                                            লেখক : ফতোয়া গবেষক,
ইসলামিক রিচার্স সেন্টার, বাংলাদেশ
আমরা জানি, মানুষ মাত্রই গোনাহ করে। শয়তানের ধোঁকায় এবং নফসের প্ররোচনায় মানুষ বারবার গোনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে। তবে গোনাহের মধ্যে অবিচল না থেকে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা এবং তওবা করার জন্য আল্লাহতায়ালা বান্দাকে আহ্বান জানিয়েছেন। তওবা হলো: জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে জগতের সবার গোনাহ মাফের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য সর্বদা আল্লাহতায়ালার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে। কারণ আল্লাহতায়ালার সার্বক্ষণিক সাহায্য ও অনুগ্রহ ছাড়া কারও পক্ষে গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়। তাই গোনাহ থেকে রক্ষা পেতে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু দোয়া পড়ে আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। আবার মহান আল্লাহ তায়ালাও পবিত্র কোরআনে ক্ষমা পার্থনার কিছু আয়াত নাজিল করেছেন। নাযিলকৃত আয়াত ও দোয়াগুলো হলো

১/ ‘রাব্বানা লা তুযিগ কুলুবানা বা’দা ইজ হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুনকা রাহমা- ইন্নাকা আনতাল ওয়াহহাব।’ এ দোয়া বেশি বেশি পাঠ করলে দ্বীনের পথে ও হেদায়েতের ওপর টিকে থাকা সহজ হয়। দোয়াটি পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত। যা সূরা আল ইমরানের ৮ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। অর্থ: হে আমাদের প্রতিপালক! হেদায়েত প্রদান করার পর আপনি আমাদের অন্তঃকরণকে বক্র করবেন না এবং আপনার নিকট থেকে আমাদেরকে অনুগ্রহ দান করুন! নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর দাতা।
২/ ‘ইয়া মুকাল্লিবাল কুলুব- সাব্বিত কালবি আলা দিনিক।’ এই দোয়াটি পবিত্র হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। উম্মত জননী হজরত উম্মে সালমা (রা.) বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বেশিরভাগ সময়ে এই দোয়াটি পাঠ করতেন। এটা রাসূলের শিখানো দোয়া বিশেষ। অর্থ: হে অন্তরসমূহের ওলট-পালটকারী! আমার অন্তরকে আপনার দ্বীনের ওপর অবিচল রাখুন। -তিরমিজি
৩/ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দোয়াটি বেশি বেশি পাঠ করতেন- ‘আল্লাহুম্মা মুসাররিফাল কুলুব সাররিফ কুলুবানা আলা ত-আতিক।’ অর্থ: হে আল্লাহ! (আপনি) হৃদয়সমূহের পরিবর্তনকারী! আমাদের হৃদয়গুলোকে আপনার আনুগত্যের দিকে ঘুরিয়ে দিন। -সহিহ মুসলিম
৪/ হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) এ‌ই দোয়াটিও করতেন— ‘আল্লাহুম্ম ইন্নী আসআলুকাল হুদা ওয়াততুকা ওয়াল আফাফা ওয়াল গিনা।’ অর্থ: হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হেদায়েদত, তাকওয়া, সচ্চরিত্রতা ও প্রাচুর্য্যতার প্রার্থনা করছি। -সহিহ মুসলিম আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে সব ধরনের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার তওফিক দান করুন। আমিন।
সফল হতে পরিকল্পনামাফিক আমরা অনেক কাজই করে থাকি। সাফল্যের পেছনে ছুটোছুটি করি। সফল হতে গেলে মাত্র চারটি বিষয়ে মনোযোগী হতে হয়।
এই চারটি বিষয় আয়ত্ত করতে পারলে যেকোনো মানুষই সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে – ইহকালে এবং পরকালেও। সূরা ‘আসরের দ্বিতীয় আর তৃতীয় আয়াতে আল্লাহ তাআলা এই চারটি বিষয় আমাদের বলে দিয়েছেন। তাহলে জেনে নেওয়া যাক সেই চারটি বিষয়:
১. বিশ্বাস রাখুন: “ঈমান” শব্দের অর্থ হলো বিশ্বাস। মৃত্যু পরবর্তী জীবনে সফলতা চাইলে এক আল্লাহ তাআলা, তাঁর রাসূল (সা.) এবং রাসূল (সা.) এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে তাতে বিশ্বাস রাখতে হবে। আর এই জীবনে সাফল্য অর্জন করতে হলে আমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে – “আমি পারবই ইনশা’ আল্লাহ”। হাল ছেড়ে দিলে চলবে না।
উচ্চারণ: ওয়াল ‘আসর ইন্নাল ইনসা-না লাফিই খুসর। ইল্লাল্লাযিনা আ-মানু… (সূরা ‘আসর ১-২) অর্থ: সময়ের শপথ, নিশ্চয়ই মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত। তারা ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে…
২. যা করা দরকার তা করে যান: অনেক সময় আমাদের এমন হয় যে – নামায পড়তে ইচ্ছা করে না, যিকর করতে মন চায় না, কোরআন মজিদ পড়ারও আগ্রহ পাওয়া যায় না – তবু যেহেতু আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল (সা.) এই আমলগুলো আমাদের করতে বলেছেন – তাই এগুলো করে যেতে হবে।
একইভাবে, দুনিয়াতে সাফল্য লাভের জন্যও কিছু রুটিন ওয়ার্ক আছে, সেগুলি আমাদের করে যেতে হবে। যেদিন ভালো লাগবে সেদিনও একজন ছাত্রকে পড়তে বসতে হবে, যেদিন ভালো লাগবে না সেদিনও তাকে পড়তে বসতে হবে; একজন চাকুরিজীবীর যেদিন কাজে মন বসবে সেদিন অফিসের কাজ করতে হবে।
আবার কাজে মনোযোগ না বসলেও জোর করে অফিসের কাজ করে যেতে হবে। যা করা উচিত তা করতে থাকতে হবে, আজ বা আগামীকাল এর ফল চোখে না দেখা গেলেও, পরশু এর ফল ঠিকই পাওয়া যাবে।
وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ উচ্চারণ: ওয়া ‘আমিলুস স্বয়ালিহ্বা-তি… (সূরা ‘আসর ৩) অর্থ: যারা ভালো কাজ করে
৩. নতুন কিছু শিখুন: আল্লাহ তাআলা কোরআন মাজিদের সূরা ফাতির-এর ২৮ নং আয়াতে বলেছেন- إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاء إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ غَفُورٌ “আল্লাহ তাআলার বান্দাদের মধ্যে শুধু তারাই তাঁকে ভয় করে যাদের জ্ঞান আছে”। ইসলাম সম্পর্কে আপনি যত জানবেন ততই প্রাত্যহিক ইবাদতগুলো আপনার কাছে ধীরে ধীরে গভীর অর্থবহ হয়ে উঠবে। নামায-রোযাকে আপনার কাছে কেবল রুটিন ওয়ার্ক কোনো ব্যাপার বলে মনে হবে না, বরং তখন আপনি এই ইবাদতগুলোর মাঝে ঈমানের সুমিষ্ট স্বাদ আস্বাদন করতে থাকবেন।
পার্থিব জীবনেও সেই ব্যক্তি তত সফল, যে অন্য মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে সবচেয়ে বেশী অবদান রাখতে পারে। আর অন্যের উপকারে আসতে চাইলে, আগে নিজের উন্নয়ন করতে হবে। ভালো কথা অন্যকে বলতে হলে আগে নিজেকে ভালো কথা শিখতে হবে।
وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ উচ্চারণ: ওয়াতা ওয়া- সাওবিল হাক্কি… (সূরা ‘আসর ৩) অর্থ: একে অপরকে সঠিক উপদেশ দেয়
৪. মানুষের উপকারে আসো: নবী হওয়ারও আগে হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন মক্কার সবচেয়ে বিশ্বস্ত আর পরোপকারী মানুষ। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সমস্ত জীবন ব্যয় করেছেন অন্য মানুষদের ভাগ্য উন্নয়নে। যত অল্প টাকাই হোক না কেন আমরাও তা দিয়েই মানুষকে সাহায্য করব, যত অল্প শ্রমই হোক না কেন তা দিয়ে মানুষের উপকার করব।
যত অল্পই শিখি না কেন, তা অন্যদের সাথে শেয়ার করব। পরিবার, বন্ধু, প্রতিবেশীসহ সব মানুষকে উপকারের চেষ্টা করব। কারো কাছ থেকে প্রতিদান চাইবো না, প্রতিদান চাইবো শুধুই আল্লাহর কাছে।
মানুষকে উপকার করার এই পথ মধুর না, বন্ধুর। অনেক সমালোচনা-গালমন্দ শুনব, অনেক অকৃতজ্ঞ মানুষের দেখা পাবো, অনেক সময় আর্থিক বা সামাজিক সংকটে পর্যন্ত পড়ে যেতে পারি – তবু ধৈর্য্য ধরব। যত অল্পই হোক না কেন, নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী বিলিয়ে দেবো। হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, খেজুরের অর্ধেকটা দান করে হলেও নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও (বুখারী)।
وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ উচ্চারণ: ওয়াতা ওয়া- সাওবিস সবর। (সূরা আসর-৩) অর্থ: একে অপরকে ধৈর্য্যের উপদেশ দেয়।
দ্বিতীয়-তৃতীয় আয়াতে বর্ণিত এই চারটি কাজ যদি আমরা না করি তাহলে আমরা মারাত্মক ক্ষতির মধ্যে ডুবে যাবো। এই ক্ষতির ভয়াবহতা যে কতটা চরম তা বুঝাতে আল্লাহ তাআলা এই কাজগুলোর উপর চারভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছেন।
এক. প্রথম আয়াতে আল্লাহ তাআলা সময়ের কসম নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা কোন কিছু কসম নেয়ার অর্থ হচ্ছে তার পরের কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ।
দুই. আল্লাহ তাআলা “ইন্না” দিয়ে বাক্য শুরু করে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। “ইন্না” শব্দের অর্থ হলো “নিশ্চয়ই”।
তিন. আল্লাহ তাআলা “ইন্নাল ইনসানা ফী খুসর” (নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে), না বলে “ফী” এর আগে “লা” যুক্ত করেছেন। এই “লা” এর অর্থ হলো “অবশ্যই”। সুতরাং আল্লাহ তাআলা যখন বললেন “ইন্নাল ইনসানা লাফী খুসর”, এর অর্থ দাঁড়ায় “নিশ্চয়ই অবশ্যই মানুষ ক্ষতির মধ্যে আছে”।
চার. আল্লাহ তাআলা তৃতীয় বাক্য শুরু করলেন “ইল্লা” (“শুধু তারা বাদে” বা Except) দিয়ে। ইল্লা দিয়ে কোন বাক্য শুরু করা হলে সেটা পূর্ববর্তী বাক্যের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। যেমন – কোন ক্লাসের ১০০ জন ছাত্রের মধ্যে যদি ৯৫ জন ফেইল করে তাহলে টিচার বলবেন –
“এই ক্লাসের ছাত্ররা ফেল করেছে, শুধু কয়েকজন বাদে”, অর্থাৎ ফেল করাটাই যেন স্বাভাবিক ঘটনা, পাশ করাটা হলো ব্যতিক্রম। একইভাবে, আল্লাহও তাআলা বলতে চাইছেন যে, অধিকাংশ মানুষই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে, শুধু গুটিকয় আছে যারা সঠিক পথে আছে।
আমাদের অফিসের কোন বিশ্বস্ত কলিগ যদি এক বা দুইবার নয়, চার চারবার ফোন করে বলে – “বন্ধু, মহাখালীর রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়েছে, বিরাট জ্যাম, ভুলেও ঐ পথে যেও না, ঘুরে যাও” – তাহলে আমরা বাসায় ফিরতে নিশ্চিত মহাখালীর রাস্তা নিব না।
আর, আমাদের পালনকর্তা প্রভু যখন আমাদের একই আয়াতে চারবার সতর্ক করে কোন কিছু করতে আদেশ করেন তখন আমরা কত অনায়াসে সেই আদেশ অমান্য করে দিনাতিপাত করতে থাকি! ইমাম শাফেঈ’ রহ. বলেছেন – লোকে যদি শুধু এই সূরা (সূরা ‘আসর) নিয়ে চিন্তা করত, সেটাই তাদের জন্য যথেষ্ট হত।

১. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যে নিজে কোরআন শেখে এবং অন্যকে শেখায়। ’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫০২৭)
২. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম আচরণের অধিকারী।
’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৬০৩৫)
৩. মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বসেরা ব্যক্তি সে, যে ঋণ পরিশোধের বেলায় ভালো। ’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ২৩০৫)
৪. রাসুলে করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি, যার কাছ থেকে সবাই কল্যাণ আশা করে, অনিষ্টের আশঙ্কা করে না। ’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ২২৬৩/২৪৩২)
৫. রাসুলে করিম (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ওই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে ভালো। ’ (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নম্বর : ৪১৭৭)
৬. মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সেরা মানুষ সে, যার বয়স দীর্ঘ ও কর্ম ভালো হয়। ’ (জামিউল আহাদিস, হাদিস : ১২১০১)
৭. মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘সর্বোত্তম মানুষ সে, যে মানবতার জন্য অধিক কল্যাণকর ও উপকারী। (সহিহুল জামে, হাদিস নম্বর : ৩২৮৯)
৮. মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘শ্রেষ্ঠ মানুষ হলো যার অন্তর পরিচ্ছন্ন ও মুখ সত্যবাদী। সাহাবিরা জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসুল! সত্যবাদী মুখ বোঝা গেল, কিন্তু পরিচ্ছন্ন অন্তরের অধিকারী কে? রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, যে অন্তর স্বচ্ছ ও নির্মল, মুত্তাকি, যাতে কোনো পাপ নেই, বাড়াবাড়ি বা জুলুম নেই, নেই খেয়ানত ও বিদ্বেষ। (সহিহুল জামে, হাদিস : ৩২৯১)
৯. মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম সঙ্গী সে, যে তার সঙ্গীর কাছে উত্তম। আর আল্লাহর কাছে সর্বোত্তম প্রতিবেশী সে, যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।
’ (তিরমিজি, হাদিস নম্বর : ১৯৪৪)
১০. রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যার চরিত্র সবচেয়ে বেশি সুন্দর। ’ (বুখারি, হাদিস নম্বর : ৩৫৫৯)
                                                                                                                 লেখক : মুফতি তাজুল ইসলাম ইসলামী গবেষক
দ্বীনে আসার শুরুর দিকে রক্ত গরম তারুণ্যের কাছে সবচেয়ে আলোচিত দুইটা বিষয় থাকে জিহাদ এবং বিয়ে। এবং দুঃখজনক হলেও সত্যি এই দুইটা ব্যাপারেই শুরুর দিকে বেশীরভাগ ছেলেরা এক ধরণের ফ্যান্টাসির মধ্যে থাকে, একটা ঘোরের মত। এই দুইটা বিষয় নিয়ে ফেসবুকে গরম গরম স্ট্যাটাস দেওয়া, দল বেঁধে কমেন্টস ,দ্বীনি সার্কেলে আড্ডা, দিনে তিনবেলা ভাত খাওয়ার মতই তা একসময় স্রেফ একটা অভ্যাস হয়ে উঠে। অথচ জিহাদ কিংবা বিয়ে দুইটার একটাও স্রেফ একঘেয়ে আসর মাতানো আড্ডার উপলক্ষ্য নয়, কখনো ছিলও না।

একথা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই সামাজিক, পারিবারিক এবং অন্যান্য পারিপার্শিক অবস্থার কারণে আজকের মুসলিম সমাজে যে কয়টা জিনিস কঠিন হয়ে গেছে বিয়ে তার মধ্যে একটি। এর মধ্যে ছেলেরা যদি আবার এই বিয়ে নিয়ে ফ্যান্টাসির মধ্যে থাকে তবে সেটা এই কঠিন বিষয়টাকে অসম্ভবের কাছাকাছি ঠেলে দেওয়ার মত। আমার বোনের বিয়ে, জাহিলিয়াতের কিছুই আমি আটকাতে পারি নি। তার অন্যতম কারণ আমার পরিবার আমার টাকায় চলে না। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই কঠিন বাস্তবতা, আপনি তখনই পরিবারের লাগাম ধরে রাখতে পারবেন যখন পরিবার আপনার টাকায় চলবে, তখনই আপনি ভালো মন্দ নির্ধারণ করে দিতে পারবেন। যে আপনি পরিবারের কোন ভাইটাল ইশ্যুতে ডিসিশান মেকিং পজিশন রাখতে পারেন না আপনার পক্ষে বিয়ে করে সেই পরিবারে নিজের বউকে শরিয়া মোতাবেক রাখাও সম্ভব নয়। বিশেষ করে যেসব ভাইরা দ্বীনি কিন্তু তাদের ফ্যামিলি দ্বীনি নয়। একদিকে পরিবারের কাছে নতজানু অন্যদিকে বউকে আলাদা বাসস্থানের ব্যবস্থাও করে দিতে না পারা, এর ফলাফল খুবই ভয়াবহ হয়ে উঠে। অনেক ভাই ফেসবুকে সারাদিন আহাজারি করেন, মেয়েরা দাড়িওয়ালা পছন্দ করেনা, মেয়েরা দ্বীন খোঁজে না টাকা খোঁজে, মেয়ের বাবা মা প্রতিষ্ঠিত ছেলেদের কাছেই মেয়ে বিয়ে দেয় ইত্যাদি ইত্যাদি, এবং তাদের বিয়ের চেষ্টা হলো এতি ফেসবুক পর্যন্ত। এসব ফ্যান্টাসিবয়দের ধরে যদি বলেন, এই যে এই হল পাত্রী আর এই হল কাজি, নে এবার বিয়া কর, তারপর আমতা আমতা করে বলবে না মানে ইয়ে……আমার আম্মু……মানে আমার বাসায়……! That’s it bro, that’s it! . তার মানে এই নয় যে সব পরিবারই এমন কিংবা সব দ্বীনি ভাইদের পরিস্থিতিই এমন। তবে আমার মতে এক্ষেত্রে মেয়ে পক্ষের দিক থেকে একটু ছাড় দেওয়ার মানসিকতাটা বেশি দেখানো উচিত। কেননা এই সমাজে যতই দ্বীনি পাত্র খোঁজা হোক না কেন দিনশেষে কেন জানি তা দুনিয়াবি কোয়ালিফিকেশনের মানদণ্ডে গিয়ে ঠেকে। সেদিন একটা ঘটনা শুনে খুব খারাপ লাগল। দ্বীনি পাত্র খোঁজার পরও এক দ্বীনি ভাইয়ের বিয়ে আর হয়নি কারণ ঐ দ্বীনি ভাই মাত্র(!) বিশ হাজার টাকা বেতন পান বলে। খুবই দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে আমাদের বোনেরা আইশা (রাঃ) এর মত হতে চান, স্বামী হিসেবেও রাসূল (সাঃ) এর মত মানুষ চান কিন্তু মা আইশার মত রাসূল (সাঃ) এর দারিদ্রতা, দিনের পর দিন না খেয়ে থাকা, তালি জোড়া দেওয়া কাপড় পরে সুখে থাকার বাস্তবতাটা নিতে চান না। যদিও সেরকম এক্সট্রিম কেস এই জমানায় “দ্বীনি পাত্রদের” নেই বললেই চলে। তারপরও সারাদিন সাহাবাদের সাদাসিধে, দুনিয়াবিমুখ, হতদরিদ্র জীবনের আবেগাপ্লুত আলোচনা শেষে ঐ দুনিয়াবি “প্রতিষ্ঠিত” পাত্রটিরই মার্কেট ডিমান্ড বেশি থাকে। বংশ ভালো, দুনিয়াবি শুশিক্ষিতা, দেখতে শুশ্রী মেয়েটিরই পাত্রের “অপশন” বেশি থাকে।
দ্বীন এবং দুনিয়া দুইটাই যদি পাওয়া যায়, তাহলে তো সোনায় সোহাগা, কিন্তু বাস্তবতা হলো “সত্যিকারের” দ্বীন আর দুনিয়ার সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক, দুইটা একসাথে চলে না, অতীতের কারো চলে নি। দারিদ্রতা, অভাব অনটন, অনাহার এসব রহমানের বান্দাদের অলংকার। কেউ যদি চায় সে একজন সত্যিকারের আল্লাহর বান্দাকে বিয়ে করবে তার উচিত মুমিনের এসব অলংকার গলায় বেঁধে নেওয়ার মত ঈমানও অর্জন করা। উম্মাহর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্ম সাহাবিরা আজকের দ্বীনি পাত্রদের চেয়ে অবিশ্বাস্য রকম দারিদ্রতা আর অভাব অনটনের মধ্য দিয়ে গেছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সত্তরজন আসহাবে সুফফাকে দেখেছি তাঁদের কারো কারো চাদর ছিল না। কারো হয়তো একটি লুঙ্গি আর কারো একটি কম্বল ছিল। তারা এটাকে নিজেদের গলায় বেঁধে রাখতেন। কারোরটা হয়ত তাঁর পায়ের গোছার অংশ পর্যন্ত পৌঁছত; আর কারোরটা হাঁটু পর্যন্ত। লজ্জাস্থান দেখা যাওয়ার ভয়ে তারা হাত দিয়ে এটাকে ধরে রাখতেন। (বুখারী) ।
ইসলামকে ভালোবাসি আমরা সবাই, কিন্তু ইসলামের জন্য ভালোবাসা আর ইসলামের সাথে জীবন যাপন করা এক জিনিস নয়। এই ফ্যান্টাসি থেকে যত দ্রুত বের হয়ে আসা যায় ততই উত্তম। আল্লাহ আমাদের জন্য সহজ করে দিন। আমীন।
                                                                                      উৎস:  Bujhtesina Bishoyta পেইজ থেকে নেওয়া
দেহ ও আত্মার সমন্বিত চাহিদার নিয়ন্ত্রিত স্ফুরণকে মূল্যবোধ (Value) বলা হয়। মানুষ ও জীব জগতের কল্যাণ সাধনের মধ্যেই তা প্রতিফলিত হয়। এই কল্যাণ সাধনের মাত্রার উপর মূল্যবোধের মাত্রা নির্ভর করে। শেষনবী মুহাম্মাদ (ছাঃ) প্রেরিত হয়েছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্য’ (ছহীহাহ হা/৪৫)। যে কাজে জীব জগতের কল্যাণ নেই, তা মূল্যবোধের বিরোধী এবং তা অগ্রাহ্য। মানুষের মূল্যবোধের সুষ্ঠু বিকাশ ও সমাজের যথার্থ অগ্রগতির জন্যই ধর্মের সৃষ্টি। যা ধারণ করে মানুষ বেঁচে থাকে। সেকারণ পৃথিবীতে আদমকে প্রেরণের সাথে সাথে আল্লাহ তাঁর হেদায়াত প্রেরণ করেন (বাক্বারাহ ২/৩৮)। যেটাই হ’ল প্রকৃত ধর্ম। যা নিখুঁৎ। কিন্তু পরে মানুষ হঠকারিতা করে এ থেকে দূরে সরে যায় (বাক্বারাহ ২/২১৩) এবং নিজেরা ধর্মের নাম দিয়ে বহু রীতি-নীতি তৈরী করে। যেখানে থাকে স্বেচ্ছাচারিতার নানা সুযোগ। সেকারণ মন্দপ্রবণ মানসিকতা সেটিকে লুফে নিতে আগ্রহী হয়। কিন্তু আল্লাহপ্রেরিত ধর্মে স্বেচ্ছাচারিতার কোন সুযোগ থাকে না। ফলে মানুষ সেটাকে প্রশংসা করলেও তাকে গ্রহণে অনাগ্রহী হয়। বরং আতংকিত হয় একারণে যে, এখানে অন্যায়ের কোন সুযোগ পাওয়া যায় না। অথচ যে সমাজে মূল্যবোধ যত বেশী নিরাপদ হবে, সে সমাজে তত বেশী শান্তি ও সুখ নিশ্চিত হবে। এমন অবস্থা হবে যে, কেউ কারু প্রতি অন্যায় হস্তক্ষেপ করবে না। কেউ কারু জান-মাল ও ইযযতের কোন ক্ষতি করবে না। বরং প্রত্যেকে হবে প্রত্যেকের জন্য রক্ষাকবচ। কারু অসাক্ষাতেও কেউ কারু অমঙ্গল চিন্তা করবে না। বরং তার কল্যাণের জন্য দো‘আ করবে। যা ফেরেশতাগণ লিখে নিবেন ও ক্বিয়ামতের দিন তাকে উত্তম পুরস্কার দিবেন।[1]

অতএব যে মতবাদ মানুষের জৈববৃত্তিকে জীবন থেকে ছেঁটে ফেলতে চায় এবং কেবল আত্মিক উন্নতিকে অগ্রাধিকার দেয়, সেটি যেমন অগ্রাহ্য; তেমনি যে মতবাদ কেবল জৈববৃত্তিকেই অগ্রাধিকার দেয় এবং আত্মিক উন্নতিকে অস্বীকার করে, সে মতবাদ তেমনি অগ্রাহ্য। উভয়ের পূর্ণতার মধ্যেই প্রকৃত সুখ ও শান্তি নিহিত। ইসলাম সে পথেই মানুষকে আহবান করে।
 বস্ত্তবাদী ও জঙ্গীবাদীরা ক্ষমতা দখলের মাধ্যমে তাদের ভ্রান্ত মতবাদের প্রসার ঘটাতে চায়। অন্যদিকে অধ্যাত্মবাদীরা জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে চায়। অথচ প্রতিটিই ব্যর্থ। মানুষের হৃদয়ে টিকে থাকে কেবল সেটাই, যেটা মানুষের আত্মিক ও জৈবিক উভয় চাহিদার সমন্বয় ঘটায় এবং যেটি আল্লাহর পক্ষ হ’তে প্রেরিত। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহ রূপে যা ক্বিয়ামত পর্যন্ত মানুষকে শান্তির পথ দেখাবে।
জৈবিক ও অর্থনৈতিক বিষয়ের অতি মূল্যায়নের জন্যই আজকের সমাজে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় ঘটেছে। অথচ মানবতার শুরু হয় অন্যের প্রয়োজন মিটানোর প্রতি মনোনিবেশ করার পর থেকেই। মানব জীবন থেকে মূল্যবোধ বিযুক্ত হ’লে মনুষ্য নামের উপযোগী কোন বৈশিষ্ট্যই আর বাকী থাকে না।
মানুষের মূল্যবোধকে অক্ষুণ্ণ ও উন্নত করার জন্য এযাবৎ মনুষ্যকল্পিত যত পথ-পন্থা বের হয়েছে এবং কথিত ধর্মসমূহে যেসব নীতি ও বিধান প্রণীত হয়েছে, সে সবের ঊর্ধ্বে আল্লাহ প্রেরিত বিধানই সর্বোত্তম ও চূড়ান্ত। মানুষের জন্য ইসলামই হ’ল আল্লাহর মনোনীত একমাত্র ধর্ম (আলে ইমরান ৩/১৯)। এর বাইরে অন্যত্র কোন বিধান তালাশ করলে তা আল্লাহর নিকট কবুল হবে না এবং চূড়ান্ত বিচারে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে (আলে ইমরান ৩/৮৫)।
কিভাবে মাটিতে চলতে হবে, সাগরে ডুব দিতে হবে, আকাশে উড়তে হবে, মহাশূন্যে পাড়ি দিতে হবে, তা আবিষ্কার করতে মানুষ সক্ষম। কিন্তু কিভাবে সে সুখী হবে, কিভাবে তার মূল্যবোধ কার্যকর হবে, তার পথ-পন্থা আবিষ্কারে সে অক্ষম। এ কারণেই মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ মানুষের হাতেই প্রতিনিয়ত পর্যুদস্ত হয়। বর্তমান সভ্যতার অদ্ভূত গোঁজামিল এই যে, বিশ্বশান্তির নামে বিশ্বধ্বংসের খাতে বিশ্বের অধিকাংশ মেধা ব্যয় হচ্ছে। রাষ্ট্রনেতারা মারণাস্ত্র তৈরীতে যতখানি আগ্রহী, জীবনের মূল্য নির্ধারণে ও মানুষের মূল্যবোধের উন্নয়নে ততখানি আগ্রহী নন। ধনী রাষ্ট্রগুলি যদি ‘মানুষ হত্যা খাতে’র বরাদ্দ বাতিল করে ‘মানুষ রক্ষা’ খাতে সেগুলি ব্যয় করত, তাহ’লে এই সবুজ পৃথিবীটা শান্তি ও সুখের আবাসস্থলে পরিণত হ’ত। বস্ত্ততঃ যে চিন্তার মধ্যে মানবতার কল্যাণ নেই, সে চিন্তা মূল্যহীন। যে মেধা মানুষের মূল্যবোধ রক্ষায় অবদান রাখে না, সে মেধা ফলবলহীন। সাথে সাথে জ্ঞানের প্রজ্ঞাহীন ব্যবহার ও নৈতিক মূল্যবোধহীন প্রয়োগ বিশ্ব সভ্যতায় মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে। বর্তমানে আমরা সেই ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে আছি। কেননা বিশ্বের সেরা মারণাস্ত্র সমূহের সবচেয়ে বড় ডিপোগুলির বোতাম বর্তমানে এমন কিছু নেতার মুঠোর মধ্যে এসে গেছে, যাদের নৈতিক মূল্যবোধ বলতে গেলে শূন্যের কোঠায়। তারা খেলাচ্ছলেও যদি ঐ বোতাম টিপে দেন, তাহ’লে যেকোন সময় মহাশূন্যে ঝুলন্ত আনুমানিক ৬৬০০ বিলিয়ন টন ওযনের পৃথিবী নামক এই গ্রহটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হ’তে পারে।
মূল্যবোধ একটা অদৃশ্য অনুভূতির নাম। যা দেখা যায় না, কিন্তু বুঝা যায়। যা পরিমাপ করা যায় তার কর্মে ও আচরণে। বিশ্বাসের জগতে পরিবর্তন এলেই কেবল মূল্যবোধে পরিবর্তন আসে। যেখানে বিজ্ঞানীদের কোন হাত নেই। কারণ তারা বস্ত্ত নিয়ে কাজ করেন এবং সম্পূর্ণ অনুমান ও অনুমিতির মাধ্যমে অন্ধকারে পথ হাতড়িয়ে থাকেন। অন্যদিকে দার্শনিকরা আরও বেশী কল্পনাচারী। সেখানে কোন সত্য নেই, কেবলই ধারণা ছাড়া। মানুষের দেহ-মন উভয়ের যিনি স্রষ্টা। কেবল তিনিই ভাল জানেন মানুষের মানবীয় মূল্যবোধ কিসে অক্ষুণ্ণ থাকবে ও কিসে তা ক্রমোন্নতি লাভ করবে।


জাহেলী আরবের প্রচলিত মূল্যবোধ সকল যুগের নষ্ট মূল্যবোধ সমূহের প্রতিনিধিত্ব করে। যা অগ্নিকুন্ডের কিনারে পৌঁছে গিয়েছিল (আলে ইমরান ৩/১০৩)। যা পরিবর্তনের জন্য ছাহাবী বেষ্টিত ভরা মজলিসে জিব্রীলকে মনুষ্যবেশে পাঠিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আল্লাহ যে শিক্ষা দান করেছিলেন, সেটাকেই আমরা পতিত মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবনের ভিত্তি রূপে গ্রহণ করতে পারি। যে মূল্যবোধকে ধারণ করে পরবর্তীতে মুসলমানরা বিশ্ব নেতৃত্বের আসন অলংকৃত করেছিল। সেগুলি ছিল মোট ছয়টি : আল্লাহর উপরে বিশ্বাস, ফেরেশতাগণের উপর বিশ্বাস, আল্লাহর কিতাব সমূহের উপর বিশ্বাস, তাঁর রাসূলগণের উপর বিশ্বাস, বিচার দিবসের উপর বিশ্বাস এবং আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত তাক্বদীরের ভাল-মন্দের উপর বিশ্বাস (মুসলিম হা/৮)। যেগুলিকে এক কথায় ‘ঈমান’ বলা হয়। যাদের মধ্যে এই ঈমান বা বিশ্বাস যত স্বচ্ছ ও দৃঢ়, তাদের কর্ম ও আচরণ তত সুন্দর ও স্থিত। তাদের নৈতিক মূল্যবোধ থাকে তত উন্নত। যা প্রমাণিত হয়েছে পরবর্তীতে মুসলমানদের জীবনে বিভিন্ন কর্মে ও আচরণে।
উল্লেখ্য যে, ছয়টি বিশ্বাসই আমাদের জন্য অদৃশ্য। আর অদৃশ্যে বিশ্বাসকেই ঈমান বলা হয়। দৃশ্যমান বস্ত্তর উপর বিশ্বাসের প্রয়োজন নেই। কেননা সেটি সামনে দেখা যায়। দাদা-দাদী ও নানা-নানীকে দেখিনি। তাই বিশ্বাস করতে হয়। তাদের অস্বীকার করলে বাপ-মার অস্তিত্ব থাকবে না। অমনিভাবে আল্লাহকে দেখিনা। তাঁর সৃষ্টিকে দেখি। তাই তাঁকে বিশ্বাস করতে হয়। নইলে আমাদের অস্তিত্ব মিথ্যা হয়ে যাবে। বুকের মধ্যে আত্মা আছে। অথচ দেখিনা। কিন্তু তাকে অস্বীকার করলে আমাদের জীবনই মিথ্যা হয়ে যাবে। এটাই হ’ল ঈমান। শয়নে-জাগরণে সর্বাবস্থায় আমি আল্লাহর সামনে আছি। এ বিশ্বাস সৃষ্টি হ’লেই মূল্যবোধ জাগ্রত হবে ও উন্নত হবে। নইলে সত্যিকার মূল্যবোধ বলে কিছুই থাকবে না। যা থাকবে, তা কেবল লোক দেখানো।
আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসকে বলা হয় ‘ঈমান’ এবং সে অনুযায়ী বাহ্যিক আচরণকে বলা হয় ‘ইসলাম’

 উভয়ের সমন্বিত প্রকাশকে বলা হয় ‘ইহসান’ বা ‘মূল্যবোধ’। পরিবেশ ও পরিস্থিতির কারণে যার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। একই সাথে কর্মজগতেও তারতম্য ঘটে। সেকারণ ঈমানের সংজ্ঞা হ’ল,اَلتَّصْدِيْقُ بِالْجِنَانِ وَالْإِقْرَارُ بِالْلِسَانِ وَالْعَمَلُ بِالْأَرْكَانِ يَزِيْدُ بِالطَّاعَةِ وَيَنْقُصُ بِالْمَعْصِيَةِ، اَلْإِيْمَانُ هُوَ الْاَصْلُ وَالْعَمَلُ هُوَ الْفَرْعُ- ‘হৃদয়ে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি ও কর্মে বাস্তবায়নের সমন্বিত নাম, যা আনুগত্যে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় ও গোনাহে হ্রাসপ্রাপ্ত হয়। বিশ্বাস হ’ল মূল এবং কর্ম হ’ল শাখা’। যা না থাকলে পূর্ণ মুমিন বা ইনসানে কামেল হওয়া যায় না। যে ব্যক্তি, পরিবার বা সমাজে ঈমানের অবস্থান যত উচ্চে, সে সমাজে মানবিক মূল্যবোধের অবস্থান তত উচ্চে।
খারেজীগণ বিশ্বাস, স্বীকৃতি ও কর্ম তিনটিকেই ঈমানের মূল হিসাবে গণ্য করেন। ফলে তাদের মতে কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি কাফের ও চিরস্থায়ী জাহান্নামী এবং তাদের রক্ত হালাল’। যুগে যুগে অধিকাংশ চরমপন্থী ভ্রান্ত মুসলমান এই মতের অনুসারী। পক্ষান্তরে মুরজিয়াগণ কেবল বিশ্বাস অথবা স্বীকৃতিকে ঈমানের মূল হিসাবে গণ্য করেন। যার কোন হ্রাস-বৃদ্ধি নেই। তাদের মতে আমল ঈমানের অংশ নয়। ফলে তাদের নিকট কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি পূর্ণ মুমিন। আবুবকর (রাঃ)-এর ঈমান ও অন্যদের ঈমান সমান’। আমলের ব্যাপারে উদাসীন সকল যুগের শৈথিল্যবাদী ভ্রান্ত মুসলমানরা এই মতের অনুসারী।
খারেজী ও মুরজিয়া দুই চরমপন্থী ও শৈথিল্যবাদী মতবাদের মধ্যবর্তী হ’ল আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আত আহলেহাদীছের ঈমান। যাদের নিকট বিশ্বাস ও স্বীকৃতি হ’ল মূল এবং কর্ম হ’ল শাখা। অতএব কবীরা গোনাহগার ব্যক্তি তাদের নিকট কাফের নয় কিংবা পূর্ণ মুমিন নয়, বরং ফাসেক। সে তওবা না করে মারা গেলেও চিরস্থায়ী জাহান্নামী নয়। বস্ত্ততঃ এটাই হ’ল কুরআন ও সুন্নাহর অনুকূলে।

এই বিশ্বাসগত পার্থক্যের কারণেই খারেজীপন্থী লোকেরা তাদের দৃষ্টিতে কবীরা গোনাহগার মুসলমানকে ‘কাফের’ মনে করে এবং তাদের রক্ত হালাল গণ্য করে। বর্তমানে ইসলামের নামে সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদের উত্থানের মূল উৎস এখানেই। স্বার্থবাদী লোকেরা জান্নাতের স্বপ্ন দেখিয়ে এই ভ্রান্ত বিশ্বাসকেই উস্কে দিচ্ছে। যা ইসলামের বিশুদ্ধ আক্বীদার পরিপন্থী। প্রায় সব দেশেই শৈথিল্যবাদী মুসলমানের সংখ্যা বেশী। চরমপন্থীরা এই সুযোগটা গ্রহণ করে এবং মানুষকে নিজেদের দলে ভিড়ায়। আমরা শৈথিল্যবাদী ও চরমপন্থী সকলকে ইসলামের চিরন্তন মধ্যপন্থী আক্বীদায় ফিরে আসার আহবান জানাই।
ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় দলীল হিসাবে আমরা নিম্নের আয়াতটিকে গ্রহণ করতে পারি। যেমন আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَإِذَا تُلِيَتْ عَلَيْهِمْ آيَاتُهُ زَادَتْهُمْ إِيمَانًا وَعَلَى رَبِّهِمْ يَتَوَكَّلُونَ- الَّذِينَ يُقِيمُونَ الصَّلاَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ- أُولَئِكَ هُمُ الْمُؤْمِنُونَ حَقًّا لَهُمْ دَرَجَاتٌ عِنْدَ رَبِّهِمْ وَمَغْفِرَةٌ وَرِزْقٌ كَرِيمٌ- ‘মুমিন কেবল তারাই, যখন তাদের নিকট আল্লাহকে স্মরণ করা হয়, তখন তাদের অন্তর সমূহ ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর যখন তাদের উপর তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করা হয়, তখন তাদের ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা তাদের প্রতিপালকের উপর ভরসা করে’। ‘যারা ছালাত কায়েম করে এবং তাদেরকে আমরা যে জীবিকা দান করেছি, তা থেকে খরচ করে’। ‘এরাই হ’ল সত্যিকারের মুমিন। এদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট রয়েছে উচ্চ মর্যাদা, ক্ষমা ও সম্মানজনক রূযী’ (আনফাল ৮/২-৪)
অত্র আয়াতে হৃদয়ে বিশ্বাস ও কর্মে বাস্তবায়নের সমন্বয়ে পূর্ণ ঈমানের সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। প্রখ্যাত তাবেঈ হাসান বাছরী (২১-১১০ হি.)-কে জিজ্ঞেস করা হ’ল, أَمُؤْمِنٌ أَنْتَ؟ ‘আপনি কি মুমিন? তিনি বললেন, الْإِيمَانُ إِيمَانَانِ ‘ঈমান দু’ভাগে বিভক্ত’। এক্ষণে যদি তুমি আমাকে ঈমানের ছয়টি স্তম্ভ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর, তাহ’লে আমি বলব যে, فَأَنَا مُؤْمِنٌ ‘আমি একজন মুমিন’। আর যদি তুমি আমাকে সূরা আনফাল ২-৪ আয়াতে বর্ণিত প্রকৃত মুমিন সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর,فَوَاللهِ مَا أَدْرِي أَنَا مِنْهُمْ أَمْ لاَ ‘তাহ’লে আল্লাহর কসম! আমি জানি না, আমি তাদের অন্তর্ভুক্ত কি না’ (কাশশাফ; কুরতুবী)। অতএব যে সমাজে ঈমানী পরিবেশ যত উন্নত, সে সমাজে মূল্যবোধ ও সমৃদ্ধি তত উন্নত। সুতরাং সংশ্লিষ্ট সকলের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হ’ল পরিবারে ও সমাজে ঈমানী পরিবেশ সমুন্নত রাখা এবং সর্বদা ঈমান বৃদ্ধির জন্য সচেষ্ট থাকা। নিম্নে ঈমান বৃদ্ধির প্রধান উপায় সমূহ বর্ণিত হ’ল।- ১. আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সহ তাঁকে চেনা :
আল্লাহকে চেনার অর্থ আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান রাখা। আল্লাহকে চোখে দেখা যায় না। তাঁর নিদর্শন সমূহ দেখে তাঁকে চিনতে হয়। যেমন ধোঁয়া দেখে আগুনকে জানতে হয়। প্রত্যেক সৃষ্টিই তার সৃষ্টিকর্তার নিদর্শন। যে বিষয়ে চিন্তা করলে মানুষ তার সৃষ্টিকর্তাকে চিনতে পারে। আল্লাহ বলেন, وَفِي الْأَرْضِ آيَاتٌ لِلْمُوقِنِينَ- وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلاَ تُبْصِرُونَ؟ ‘আর দৃঢ় বিশ্বাসীদের জন্য পৃথিবীতে রয়েছে নিদর্শন সমূহ’ ‘এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যেও। অথচ তোমরা কি তা অনুধাবন করবে না?’ (যারিয়াত ৫১/২০-২১)। তিনি আরও বলেন, وَضَرَبَ لَنَا مَثَلاً وَنَسِيَ خَلْقَهُ قَالَ مَنْ يُحْيِ الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ- قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ- ‘আর সে আমাদের সম্পর্কে নানাবিধ উপমা দেয়। অথচ সে নিজের সৃষ্টি বিষয়ে ভুলে যায়। সে বলে, কে হাড্ডিগুলিকে জীবিত করবে যখন তা পচে-গলে যাবে?’ ‘তুমি বলে দাও, ওগুলিকে তিনিই জীবিত করবেন, যিনি প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলেন। আর তিনি প্রত্যেক সৃষ্টি সম্পর্কে সম্যক অবহিত’ (ইয়াসীন ৩৬/৭৮-৭৯)। তিনি উদাসীন বান্দাদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন, وَكَأَيِّنْ مِنْ آيَةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ يَمُرُّونَ عَلَيْهَا وَهُمْ عَنْهَا مُعْرِضُونَ- وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُهُمْ بِاللهِ إِلاَّ وَهُمْ مُشْرِكُونَ- ‘নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলে বহু নিদর্শন রয়েছে। তারা এসবের উপর দিয়ে অতিক্রম করে। অথচ সেগুলি হ’তে তারা উদাসীন থাকে’। ‘তাদের অধিকাংশ আল্লাহকে বিশ্বাস করে। অথচ সেই সাথে শিরক করে’ (ইউসুফ ১২/১০৫-১০৬)। অতএব আল্লাহর নিদর্শন সমূহ সম্পর্কে বান্দা যত বেশী গবেষণা করবে এবং এ বিষয়ে ছহীহ হাদীছ সমূহে যা বর্ণিত হয়েছে, তার উপর যত বেশী নির্ভরশীল হবে, তার আক্বীদা তত বেশী মযবূত হবে এবং সে তত বেশী আল্লাহর অনুগ্রহ লাভে সক্ষম হবে। সেই সাথে তার মূল্যবোধ সমুন্নত হবে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) এরশাদ করেন,إِنَّ لِلَّهِ تِسْعَةٌ وَتِسْعُونَ اسْمًا، مِائَةٌ إِلاَّ وَاحِدًا، لاَ يَحْفَظُهَا أَحَدٌ إِلاَّ دَخَلَ الْجَنَّةَ، وَهْوَ وَتْرٌ يُحِبُّ الْوَتْرَ ‘নিশ্চয় আল্লাহর ৯৯টি নাম রয়েছে। একশ’ থেকে একটি কম। যে ব্যক্তি সেগুলি গণনা করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর তিনি বেজোড়। তিনি বেজোড় পসন্দ করেন’।[2] এর অর্থ হ’ল যে ব্যক্তি ঐ নামগুলো মুখস্ত করবে পূর্ণ ঈমান ও আনুগত্যের সাথে এবং আল্লাহর উপর অটুট নির্ভরতার সাথে। উছায়লী বলেন,لَيْسَ الْمُرَادُ بِالْإِحْصَاءِ عَدَّهَا فَقَطْ لِأَنَّهُ قَدْ يَعُدُّهَا الْفَاجِرُ وَإِنَّمَا الْمُرَادُ الْعَمَلُ بِهَا ‘এর অর্থ কেবল গণনা করা নয়। কেননা অনেক সময় ফাসেক্ব-ফাজের লোকেরাও এগুলি গণনা করে থাকে। বরং এর অর্থ হ’ল ঐসব গুণাবলীর উপর আমল করা’ (ফাৎহুল বারী)


আব্দুর রহমান আস-সা‘দী বলেন,
من حفظها وفهم معانيها، واعتقدها، وتعبد لله بها دخل الجنة. والجنة لا يدخلها إلا المؤمنون فعلم أن ذلك أعظم ينبوع ومادة لحصول الإيمان وقوته وثباته، ومعرفة الأسماء الحسنى هي أصل الإيمان، والإيمان يرجع إليها…
‘এর অর্থ যে ব্যক্তি এগুলি মুখস্ত করবে, এর মর্ম সমূহ উপলব্ধি করবে, সেমতে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সে অনুযায়ী আল্লাহর দাসত্ব করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর জান্নাতে প্রবেশ করবে না মুমিন ব্যতীত। অতএব জানা গেল যে, এগুলি হ’ল ঈমান হাছিলের ও তার শক্তি বৃদ্ধির এবং তার দৃঢ়তা লাভের শ্রেষ্ঠ উৎস ধারা। আল্লাহর সুন্দর নাম সমূহ হ’ল ঈমানের মূল। আর ঈমান সেদিকেই প্রত্যাবর্তিত হয়। উক্ত মা‘রেফাত তাওহীদের তিনটি প্রকারকে শামিল করে : তাওহীদে রুবূবিয়াত, তাওহীদে ইবাদত ও তাওহীদে আসমা ও ছিফাত (প্রতিপালনে একত্ব, উপাসনায় একত্ব এবং নাম ও গুণাবলীর একত্ব)। এ তিনটিই হ’ল তাওহীদের রূহ ও তার সুবাতাস। তার মূল ও উদ্দেশ্য। যখনই বান্দার মধ্যে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মা‘রেফাত বৃদ্ধি পাবে, তখনই তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে ও তার বিশ্বাস দৃঢ়তর হবে। অতএব মুমিনের উচিৎ হবে তার ক্ষমতা অনুযায়ী আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর মর্ম উপলব্ধি করা। কেননা এই মা‘রেফাত তাকে আল্লাহর গুণশূন্য হওয়ার ও অন্যের সাথে তুলনীয় হওয়ার মত ভ্রান্ত বিশ্বাসের রোগ থেকে নিরাপদ রাখবে। যে দুই রোগে বহু বিদ‘আতী পরীক্ষায় নিপতিত হয়েছে। যা রাসূল (ছাঃ) কর্তৃক আনীত সত্যের বিরোধী। বরং প্রকৃত মা‘রেফাত সেটাই, যা কুরআন ও সুন্নাহ থেকে প্রাপ্ত এবং যা বর্ণিত হয়েছে ছাহাবী ও তাবেঈগণ থেকে। আর এই উপকারী মা‘রেফাত তার অধিকারী ব্যক্তির ঈমান বৃদ্ধিতে ও বিশ্বাসের দৃঢ়তা আনয়নে এবং শত বাধায় প্রশান্তি লাভে সহায়ক হবে’।[3] অতএব যে ব্যক্তি এই মা‘রেফাত অনুযায়ী আল্লাহকে চিনবে, সে ব্যক্তি মানুষের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ঈমানেরঅধিকারী হবে ও তাদের মধ্যে আল্লাহর আনুগত্যে ও দাসত্বে সর্বাধিক দৃঢ় হবে এবং তাঁর ভয়ে ও তাঁর বিষয়ে সতর্কতার দিক দিয়ে শ্রেষ্ঠ হবে। উদাহরণ স্বরূপ, বান্দা যখন তার জীবনের সকল ভাল-মন্দ এবং হায়াত-মউত, রিযিক, রোগ ও আরোগ্য সবকিছুর মালিক হিসাবে স্রেফ আল্লাহকে জানবে, তখন সে অন্তর থেকে আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসাকারী হবে এবং তার সকল কর্মে তার নিদর্শন স্পষ্ট হবে। সে কখনোই উল্লাসে ফেটে পড়বে না বা হতাশায় ভেঙ্গে পড়বে না। বরং ভিতরে-বাইরে আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ ভরসাকারী হবে ও সর্বাবস্থায় আল্লাহর প্রশংসাকারী হবে।
যখন বান্দা জানবে যে, আল্লাহ অমুখাপেক্ষী, সকল ক্ষমতার মালিক, গুণগ্রাহী, সহনশীল ও প্রশস্ত ক্ষমার অধিকারী, তিনি করুণাময় ও কৃপানিধান; তখন সে আর কারু মুখাপেক্ষী হবে না। কোন শক্তিমানের প্রতি দুর্বল হবে না। পাপ করেও আল্লাহর ক্ষমা থেকে নিরাশ হবে না। যেকোন বৈধ প্রার্থনায় সে আল্লাহর নিকট দৃঢ় আশাবাদী হবে। সে কেবল আল্লাহর কাছেই চাইবে ও তাঁকেই ভয় করবে। তার মস্তক সর্বদা উন্নত থাকবে। কারু নিকট সে মাথা নত করবে না।
বান্দা যখন জানবে যে, আল্লাহ সবচেয়ে সুন্দর। সে সুন্দরের কোন তুলনা নেই।

 তখন তাঁকে দেখার জন্য ও তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য সে পাগলপারা হয়ে উঠবে। পৃথিবীর কোন সৌন্দর্য তাকে আকৃষ্ট করতে পারবে না। কোন বিলাসিতা তাকে স্পর্শ করবে না। কোন সুখ-সম্ভোগ তাকে আল্লাহর মহববত থেকে ফিরাতে পারবে না।
এভাবে আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর দিকেই বান্দার দাসত্ব বা উবূদিয়াতের সবকিছু প্রত্যাবর্তিত হবে এবং এর মধ্যেই তার দাসত্বের পূর্ণরূপ বিকশিত হবে। বস্ত্ততঃ এটাই হ’ল আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর প্রকৃত অনুধাবন বা মা‘রেফাত।
ভ্রান্ত ফিরক্বা সমূহের অনুসারীরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর কাল্পনিক অর্থ করেছেন ও বিকৃত ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের মতে আল্লাহ নিরাকার ও গুণহীন সত্তা। তারা ‘আল্লাহর হাত’ অর্থ করেন তাঁর কুদরত ও নে‘মত, ‘চেহারা’ অর্থ করেন তাঁর সত্তা বা ছওয়াব ইত্যাদি। অথচ সঠিক আক্বীদা এই যে, আল্লাহ অবশ্যই আকার ও গুণযুক্ত সত্তা। তবে তা কারু সাথে তুলনীয় নয়। তিনি শোনেন ও দেখেন। কিন্তু সেটা কিভাবে, তা জানা যাবে না। কেননা তাঁর সত্তা ও গুণাবলী বান্দার সত্তা ও গুণাবলীর সাথে তুলনীয় নয়। ভিডিও ক্যামেরা মানুষের কথা ও ছবি ধারণ করে। তার নিজস্ব আকার ও চোখ-কান আছে। কিন্তু তা অন্যের সাথে তুলনীয় নয়। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সমূহে আল্লাহর হাত, আঙ্গুল, পায়ের নলা, চেহারা, চক্ষু, কথা বলা, আরশে অবস্থান, নিম্ন আকাশে অবতরণ, ক্বিয়ামতের দিন নিজ আকারে মুমিনদের দর্শন দান ইত্যাদি অনেক বিষয়ে বর্ণিত হয়েছে। কিন্তু তার ধরন মানুষের অজানা। যেমন আল্লাহ বলেন, لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ  ‘তাঁর তুলনীয় কিছুই নেই। তিনি সবকিছু শোনেন ও দেখেন’ (শূরা ৪২/১১)। আবার এসবের অর্থ আমরা জানিনা বলে তা বুঝার জন্য আল্লাহর উপর ন্যস্ত করাও যাবে না। বরং পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ সমূহে বর্ণিত এসবের প্রকাশ্য অর্থের উপর বিশ্বাস করতে হবে। যেমনটি করেছেন ছাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীন কোনরূপ পরিবর্তন, শূন্যকরণ, প্রকৃতি নির্ধারণ, তুলনাকরণ বা আল্লাহর উপরে ন্যস্তকরণ(من غير تحريف وتعطيل وتكييف وتمثيل وتفويض) ছাড়াই। ভ্রান্ত বিশ্বাসীরা আল্লাহকে স্বীকার করলেও তাঁর গুণাবলীর ভ্রান্ত ব্যাখ্যার কারণে তাঁর উপরে ভরসা করে নিশ্চিন্ত হয় না। ফলে তারা তাদের ধারণা মতে বিভিন্ন উপাস্যকে অসীলা হিসাবে গ্রহণ করে ও তাদের উপরেই ভরসা করে। তাদেরকে খুশী করার জন্য নযর-নেয়ায দেয় ও জীবনপাত করে। সেজন্যই তো দেখা যায়, মানুষ না খেয়ে মরে। অথচ কবরে নযর-নেয়াযের স্তূপ জমে। গরীবের ঘরে বাতি জ্বলে না। কিন্তু কবরের উপর বাতি জ্বলে। প্রচন্ড গরমে হিট স্ট্রোকে মানুষ মরে। অথচ কবরের উপর ফ্যান ঘোরে ও সেখানে এসি চলে। এরাই হ’ল আধুনিক যুগের ধার্মিক মানুষ।
তারা তাদের পূজিত কবরের নাম দিয়েছে ‘মাযার’। অর্থাৎ সাক্ষাতের স্থান। এই সাক্ষাৎ কার সঙ্গে? যদি তিনি কবরবাসী হন, তাহ’লে তিনি কি তাদের সাক্ষাৎ দিতে পারেন? তিনি কি সাক্ষাৎকারীদের কথা জানতে পারেন? বা তাদের কথা শুনতে পান? তিনি কি তাদের কোন ভাল-মন্দ করার ক্ষমতা রাখেন? অথচ আল্লাহ স্বীয় রাসূলকে বলেন, إِنَّكَ لاَ تُسْمِعُ الْمَوْتَى ‘নিশ্চয়ই তুমি শুনাতে পারো না কোন মৃত ব্যক্তিকে’ (নমল ২৭/৮০)। وَمَا أَنْتَ بِمُسْمِعٍ مَنْ فِي الْقُبُورِ ‘আর তুমি শুনাতে পারো না কোন কবরবাসীকে’ (ফাত্বির ৩৫/২২)
অন্ধ ভক্তরা তাদের নাম দিয়েছে ‘ছূফী’। তারা নিজেদেরকে বান্দা ও আল্লাহর মধ্যে মিলনের মাধ্যম মনে করেন। সেজন্য তারা বিভিন্ন তরীকা আবিষ্কার করেছেন। শরী‘আতকে তারা নারিকেলের ছোবড়া মনে করেন। তরীকতকে নারিকেল এবং তার শাসকে হকীকত বলেন। আর এ বিষয়ে জানাকেই তারা মা‘রেফাত বলেন। অথচ এ সবের জন্য আল্লাহ কোন প্রমাণ নাযিল করেননি।

তারা আল্লাহর যিক্রের নামে নানাবিধ শয়তানী ক্রিয়া-কান্ড করেন। কখনো তারা যিক্র করতে করতে বেহুঁশ হয়ে বাঁশের মাথায় উঠে মাটিতে লাফিয়ে পড়েন। কখনো মুখে ফেনা তুলে অজ্ঞান হয়ে হাত-পা ছোঁড়েন। আর ভাবেন তিনি ‘ফানা ফিল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর সত্তার মধ্যে বিলুপ্ত’ হয়ে গেছেন। কেউ ভাবেন তিনি ‘বাক্বা বিল্লাহ’ অর্থাৎ ‘আল্লাহর সত্তার মধ্যে স্থায়ী’ হয়ে গেছেন। এ সময় পুরুষ মুরীদ ও নারী মুরীদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ থাকে না। পীরের আত্মার মধ্যে বিলীন হয়ে আল্লাহর পরমাত্মার মধ্যে বিলুপ্ত হওয়ার সাধনাকেই তারা সর্বোচ্চ ইবাদত বলে মনে করেন। আর এই বিলুপ্ত হ’তে পারাকেই তারা সর্বোচ্চ মা‘রেফাত মনে করেন। অনেকে এটাকে রাসূল (ছাঃ)-এর মি‘রাজের সঙ্গেও তুলনা করার ধৃষ্টতা দেখান। অনেক ছূফী নিজেকে সরাসরি আল্লাহ বলতেও কছূর করেননি। কেননা তাদের নিকটে ‘যিকরের তাৎপর্য হ’ল, আল্লাহর সত্তার মধ্যে বিলীন হয়ে জ্যোতির্ময় হওয়া’। ফলে ‘যিকরকারী স্বয়ং আল্লাহতে পরিণত হয়ে যায়’। তাদের ধারণা মতে, যিক্রকারীরা আল্লাহর আত্মার মধ্যে বা আল্লাহ তাদের আত্মার মধ্যে প্রবেশ করেন এবং উভয়ে এক আত্মায় পরিণত হন। একে তাদের পরিভাষায় ‘হুলূল’ ও ‘ইত্তেহাদ’ বলা হয়। যার মাধ্যমে বান্দার আত্মা ও আল্লাহর পরমাত্মা মিশে একাকার হয়ে যায়। এজন্য তারা তাদের কথিত অলীর মর্যাদা নবীর উপরে ধারণা করেন। আর এ কারণেই আবু ইয়াযীদ বিস্তামী ওরফে বায়েযীদ বুস্তামী (১৮৮-২৬১ হি./৮০৪-৮৭৫ খৃ.) বলেন,سُبْحَانِي مَا أَعْظَمَ شَأنِى ‘মহাপবিত্র আমি, কতই না বড় আমার মর্যাদা’। তাঁর দরজায় কেউ ধাক্কা দিলে তিনি বলতেন, لَيْسَ فِى الْبَيْتِ غَيْرُ اللهِ ‘বাড়িতে কেউ নেই আল্লাহ ছাড়া’। আরেকজন ছূফী মনছূর হাল্লাজ (২৪৪-৩০৯ হি./৮৫৮-৯২২ খৃ.) বলতেন, أَنَا الْحَقُّ ‘আমিই আললাহ’।[4]
এইসব ভ্রান্ত আক্বীদার অনুসারীরা তাদের কথিত মাযারের সাথে বানিয়েছে মসজিদ। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের ঈমান যাহির করে। অথচ সিজদা করে কবরে। সাহায্য চায় কবরে। মানত করে কবরে। প্রার্থনা করে কবরে। এমনকি মসজিদেও একপাশে ‘আল্লাহ’, অন্য পাশে ‘মুহাম্মাদ’ লেখে। কখনো আল্লাহর সাথে তাদের পূজিত পীরের নাম লেখে। যেমন খাজা বাবা, গরীবনেওয়ায, গওছুল আযম, বাবা ভান্ডারী প্রভৃতি। তাদের অনুসারীদের অনেকে এগুলি গাড়ীর মাথায় লেখে যাতে এক্সিডেণ্ট না হয়। এগুলি লেখা শো-বক্স বাড়ীতে বা কর্মস্থলের দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখে যাতে বরকত হয়। যা বারবার জ্বলে ও নিভে। অনেকে হাতে হাল ধরা মুহাম্মাদের নৌকায় আল্লাহকে দাঁড় করিয়ে কাঠের ফ্রেম বানিয়ে বিক্রি করে এবং তা দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখে যাতে শয়তান প্রবেশ করতে না পারে। অথচ ‘আল্লাহ’ বা ‘মুহাম্মাদ’ কোন সাইনবোর্ড নন। বরং আল্লাহ হৃদয়ের বস্ত্ত। যাঁকে বিশ্বাস করতে হয় একনিষ্ঠভাবে এবং তাঁর নিকট দো‘আ করতে হয় বিনীতভাবে। তাঁর সাথে অন্য কাউকে ডাকা যায় না। লেখাটি মুছে গেলে বা ভেঙ্গে গেলে কি আল্লাহ মুছে যাবেন বা ভেঙ্গে যাবেন? একইভাবে ‘মুহাম্মাদ’ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর বাণী বাহক। তিনি উম্মতের পথপ্রদর্শক। তাঁর আনুগত্য করতে হয়। অন্যদের ন্যায় তিনিও আল্লাহর রহমতের ভিখারী। সেকারণ ক্বিয়ামতের দিন ‘মাক্বামে মাহমূদ’ পাওয়ার জন্য তাঁর পক্ষে আল্লাহর নিকট প্রতি আযানের শেষে উম্মতকে দো‘আ করার জন্য তিনি নির্দেশ দিয়ে গেছেন।[5] তিনি কখনোই আল্লাহর সমতুল্য নন। তিনি কারু জন্য পরকালীন মুক্তির অসীলা নন। ক্বিয়ামতের দিন তিনি এমনকি তাঁর প্রাণপ্রিয় কন্যা ফাতেমারও কোন উপকার করতে পারবেন না বলে দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেছেন।[6] ফলে আল্লাহর সাথে অন্য কোনকিছুকে সমান গণ্য করা ও তাদের প্রতি সমানভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা পরিষ্কারভাবে ‘শিরক’। যা ক্ষমার অযোগ্য পাপ। মূর্তিপূজা, কবরপূজা, তারকাপূজা, পীরপূজা, স্থানপূজা, অগ্নিপূজা প্রভৃতি এইসব ভ্রান্ত আক্বীদা থেকে সৃষ্ট। এগুলি ‘শিরক’। যার পাপ আল্লাহ কখনোই ক্ষমা করেন না (নিসা ৪/৪৮, ১১৬)। কারণ তারা আল্লাহর বড়ত্বের মহিমা থেকে ও তাঁর গুণাবলীর ঔজ্জ্বল্য থেকে বান্দার হৃদয়কে খালি করে দিয়েছেন এবং তদস্থলে তাদের কল্পিত অসীলা সমূহকে বড় করে দেখিয়েছেন। অথচ তাওহীদের সর্বোচ্চ স্থান ও আল্লাহর গুণাবলীর জ্যোতি সমূহ দ্বারা হৃদয়কে আলোকিত করা ব্যতীত কিভাবে সেটি ঈমান পদবাচ্য হ’তে পারে? ফলে মুশরিকদের সকল সৎকর্ম বরবাদ হবে’ (যুমার ৩৯/৬৫)। সেগুলি সবই ক্বিয়ামতের দিন বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত হবে (ফুরক্বান ২৫/২৩)। তাদের জন্য আল্লাহ জান্নাতকে হারাম করেছেন’ (মায়েদাহ ৫/৭২)। অতএব সকল প্রকার ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে ছাহাবায়ে কেরাম ও কুরআন-সুন্নাহর অনুসারীগণের বিশুদ্ধ আক্বীদা ও বিশ্বাসকে সর্বান্তঃকরণে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আর সেটাই হবে প্রকৃত মা‘রেফাত বা আল্লাহকে চেনা। এর বাইরে গিয়ে প্রকৃত ঈমানদার হওয়ার কোন সুযোগ নেই। আর ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধিতেই মানবতার মূল্যবোধের হ্রাস-বৃদ্ধি নির্ভর করে। সেই সাথে নির্ভর করে সমাজের শান্তি ও স্থিতিশীলতার হ্রাস-বৃদ্ধি। শৈথিল্যবাদী মুরজিয়া ঈমানদারগণ মূল্যবোধের বিষয়ে কপট মুনাফিকদের ন্যায় উদাসীন। তারা ছালাত আদায় করে লোক দেখানো এবং উদাসীনভাবে (মা‘ঊন ১০৭/৫-৬)। তারা ছাদাক্বা করলেও তা করে অনিচ্ছুকভাবে (তওবা ৯/১০৩)। তারা যা কিছু করে তার অধিকাংশ দুনিয়াবী স্বার্থ হাছিলের জন্য করে। ফলে মানবিক মূল্যবোধ তাদের কাছে হয় গৌণ ও স্বার্থদুষ্ট।
পক্ষান্তরে খারেজী ঈমানদারগণ মূল্যবোধের বিষয়ে চরমপন্থী হয়ে থাকে। তারা কবীরা গোনাহগারদের প্রতি হয় আগ্রাসী স্বভাবের। তারা এমনকি তাদের জান-মাল-ইযযত সবকিছুকে হালাল মনে করে। আর সেজন্যই রাসূল (ছাঃ) তাদেরকে জাহান্নামের কুকুর বলেছেন।[7]
এদের বিপরীতে কুরআন-সুন্নাহর অনুসারীর ঈমান হয় সর্বদা মধ্যপন্থী। তারা শৈথিল্যবাদী বা চরমপন্থী নন। তারা সর্বাবস্থায় মানবিক মূল্যবোধকে অগ্রাধিকার দেন এবং মানুষের হেদায়াতের জন্য দো‘আ করেন। তারা সর্বাবস্থায় সমাজ সংস্কারে অগ্রণী হন এবং সেজন্য সাধ্যমতপ্রচেষ্টা চালান। ২. দ্বীনী ইলম শিক্ষা করা :
আল্লাহ বলেন, إِنَّمَا يَخْشَى اللهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ ‘বস্ত্ততঃ আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে’ (ফাতিবর ৩৫/২৮)। কেননা তারাই আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কে অধিক জ্ঞাত। অতঃপর সেটিকে তারা নিজেদের প্রার্থনায় ও নিজেদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধারণ করেন। ফলে তারাই হন সর্বাধিক আল্লাহভীরু। যা তাদের হৃদয়ে ঈমানী শক্তির জাগরণ সৃষ্টি করে। নইলে যে জ্ঞান আল্লাহভীতি জাগ্রত করে না, সে জ্ঞান ধার করা। আমরা তার থেকে আল্লাহর নিকট পানাহ চাই। ইবনু রজব হাম্বলী (মৃ. ৭৯৫ হি.) বলেন, উপকারী ইল্ম দু’টি বস্ত্তর উপর ভিত্তিশীল। (১) আল্লাহকে চেনার উপর। তাঁর সুন্দর নাম ও গুণাবলী এবং অনন্য কার্যাবলীর মাধ্যমে। যা তার মধ্যে আল্লাহর বড়ত্ব, ভীতি, ভালবাসা ও আকাংখা সৃষ্টি করে। সেই সাথে সে তাঁর প্রতি ভরসা করে, তাঁর ফায়ছালায় সন্তুষ্ট থাকে এবং তাঁর পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করে। (২) আল্লাহ কোনটি ভালবাসেন ও কোনটি বাসেন না, সেই সকল বিশ্বাস এবং প্রকাশ্য ও গোপন কথা ও কর্ম সমূহ জানার উপর। যার ফলে সে ঐসকল কাজ দ্রুত করাকে অপরিহার্য মনে করে’।[8]
এরাই হ’লেন প্রকৃত জ্ঞানী। যারা আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব সম্পর্কে গবেষণা করেন ও সেখান থেকে উপদেশ গ্রহণ করেন। তারাই আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা উপলব্ধি করেন এবং তাঁর অবাধ্যতা হ’তে বিরত থাকেন। ফলে তারাই প্রকৃত আনুগত্যের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে আল্লাহকে ভয় করে থাকেন। তারা সৃষ্টির গবেষণায় যত গভীরে ডুব দেন, তত বেশী আল্লাহর একত্ব ও মহত্ত জানতে পারেন। তখন তারা আল্লাহর দাসত্ব করেন এমনভাবে যেন তিনি আল্লাহকে সামনে দেখতে পান।একজন চিকিৎসক যখন রোগীর রক্ত নিয়ে গবেষণা করেন, আর দেখেন যে তার কণিকা সমূহ ইচ্ছামত ভেঙ্গে যাচ্ছে। আবার মিলে যাচ্ছে। তখন সে তার জ্ঞানের সর্বশেষ সীমায় গিয়ে বিস্ময়ে বলে ওঠে, সুবহানাল্লাহ! ঐ ব্যক্তি মুখ দিয়ে কেবল খাদ্য গ্রহণ করেছে। এক্ষণে সেই খাদ্য কিভাবে রক্ত উৎপাদন করল? কিভাবে বীর্য তৈরী করল? কিভাবে বুকে দুধ তৈরী করল? কিভাবে অস্থি-মজ্জা ও অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুস্থ ও শক্তিশালী করল? বিজ্ঞানী যত বেশী এসবের জবাব খুঁজতে যাবেন, তত বেশী তিনি আল্লাহকে খুঁজে পাবেন ও তাঁর নৈকট্য উপলব্ধি করবেন। আল্লাহ বলেন, وَإِنَّ لَكُمْ فِي الْأَنْعَامِ لَعِبْرَةً نُسْقِيكُمْ مِمَّا فِي بُطُونِهِ مِنْ بَيْنِ فَرْثٍ وَدَمٍ لَبَنًا خَالِصًا سَائِغًا لِلشَّارِبِينَ- ‘নিশ্চয়ই গবাদি পশুর মধ্যে তোমাদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। আমরা তোমাদেরকে তাদের থেকে বিশুদ্ধ দুধ পান করাই যা পানকারীদের জন্য অতীব উপাদেয়। যা নিঃসৃত হয় উক্ত পশুর উদরস্থিত গোবর ও রক্তের মধ্য হ’তে’ (নাহল ১৬/৬৬)। তিনি আরও বলেন,أَفَلاَ يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ- وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ- وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ- وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ- ‘তারা কি দেখে না উষ্ট্রের প্রতি, কিভাবে তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে?’ ‘এবং আকাশের প্রতি, কিভাবে তাকে উচ্চ করা হয়েছে?’ ‘এবং পাহাড় সমূহের প্রতি, কিভাবে তাকে স্থাপন করা হয়েছে?’ ‘এবং পৃথিবীর প্রতি, কিভাবে তাকে বিছানো হয়েছে?’ (গাশিয়াহ ৮৮/১৭-২০)
বস্ত্ততঃ ‘ইলম’ বলতে সেটাকে বুঝায়, যা হৃদয়ে আল্লাহভীতি আনয়ন করে এবং যার প্রভাব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রকাশ পায় (মির‘আত)। সেই সাথে কর্মজগতে যার বাস্তবায়ন ঘটে। হাদীছে জিব্রীলে রাসূল (ছাঃ)-কে ‘ইহসান’ সম্পর্কে যে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেখানে বলা হয়, أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ ‘তুমি আল্লাহর ইবাদত করবে এমনভাবে, যেন তুমি তাঁকে দেখছ। আর যদি দেখতে না পাও, তাহ’লে ভেবে নিয়ো যে তিনি তোমাকে দেখছেন’।[9]

হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللهُ لَهُ بِهِ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ ‘যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষার জন্য কোন পথ তালাশ করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দিবেন’।[10] এখানে ‘ইল্ম’ অর্থ ‘দ্বীনী ইল্ম’। কেননা দুনিয়াবী ইল্ম নাস্তিক ও বস্ত্তবাদীরাও শিখে থাকেন। সেটি জান্নাতের পথ সহজ করে দেয় না। বরং জাহান্নামের রাস্তা সহজ করে দেয়। তাছাড়া বিজ্ঞানের ভিত্তি হ’ল ‘অনুমিতি’। আর কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তি হ’ল ‘আল্লাহর অহি’। তাই স্বাভাবিক জ্ঞানে কখনো কুরআন ও বিজ্ঞানে সংঘর্ষ মনে হ’লে সেখানে অবশ্যই কুরআন অগ্রাধিকার পাবে। কুরআনী সত্যের বিপরীতে অন্য কিছুই গ্রহণীয় হবে না। ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানের বহু আবিষ্কার কুরআনের নিকট হার মানতে বাধ্য হয়েছে। আর বিশুদ্ধ হাদীছ কখনো বিশুদ্ধ জ্ঞানের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
৩. আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করা :
আল্লাহ বলেন,إِنَّ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلاَفِ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ لَآيَاتٍ لِأُولِي الْأَلْبَابِ- الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بَاطِلاً سُبْحَانَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ- ‘নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত্রি ও দিবসের আগমন-নির্গমনে জ্ঞানীদের জন্য (আল্লাহর) নিদর্শন সমূহ নিহিত রয়েছে’। ‘যারা দাঁড়িয়ে, বসে ও শুয়ে সর্বাবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি বিষয়ে গবেষণা করে এবং বলে, হে আমাদের পালনকর্তা! তুমি এগুলিকে অনর্থক সৃষ্টি করোনি। মহা পবিত্র তুমি। অতএব তুমি আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও!’ (আলে ইমরান ৩/১৯০-৯১)
প্রতিটি কর্মই তার কর্তার প্রমাণ বহন করে। অমনিভাবে প্রতিটি সৃষ্টিই তার সৃষ্টিকর্তা আল্ললাহর প্রমাণ ও তাঁর নিদর্শন  হিসাবে গণ্য হয়। হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, অত্র আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্ললাহ (ছাঃ) ছালাতে দাঁড়িয়ে যান ও কাঁদতে থাকেন। ছালাত শেষে আয়াতটি পাঠ করে তিনি বলেন, আজ রাতে এ আয়াতটি আমার উপর নাযিল হয়েছে। অতএব وَيْلٌ لِمَنْ قَرَأَهَا وَلَمْ يَتَفَكَّرْ فِيهَا ‘দুর্ভোগ ঐ ব্যক্তির জন্য যে এটি পাঠ করে অথচ এতে চিন্তা-গবেষণা করে না’।[11] এই চিন্তা-গবেষণা দুই ধরনের। এক- সৃষ্টির প্রাকৃতিক বিধান ও নিখুঁৎ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। কারণ আল্লাহ ব্যতীত কারু পক্ষেই বিশাল সৃষ্টিজগতের শৃংখলা বিধান ও সুন্দর ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। যেকারণ কল্পনার অতীত দ্রুতগতিতে ঘূর্ণায়মান সূর্য-চন্দ্র ও নক্ষত্ররাজির মধ্যে পরস্পরে সংঘর্ষ হয় না। কেউ কারু নির্ধারিত দূরত্ব ও কক্ষপথ অতিক্রম করে না। সেদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ বলেন, لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلاَّ اللهُ لَفَسَدَتَا فَسُبْحَانَ اللهِ رَبِّ الْعَرْشِ عَمَّا يَصِفُونَ- ‘যদি আকাশ ও পৃথিবীতে আল্লাহ ব্যতীত বহু উপাস্য থাকত, তাহ’লে উভয়টিই ধ্বংস হয়ে যেত। অতএব তারা যা বলে, তা থেকে আরশের মালিক আল্লাহ মহাপবিত্র’ (আম্বিয়া ২১/২২)। সুতরাং নভোবিজ্ঞান ও ভূবিজ্ঞানে গবেষণা করা ঈমানদার ও মেধাবী ব্যক্তির জন্য অপরিহার্য। যেমন আল্লাহ বলেন,قُلِ انْظُرُوا مَاذَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا تُغْنِي الْآيَاتُ وَالنُّذُرُ عَنْ قَوْمٍ لاَ يُؤْمِنُونَ- ‘বলে দাও, তোমরা চোখ খুলে দেখ নভোমন্ডলে ও ভূমন্ডলে আল্লাহর কত নিদর্শন রয়েছে। বস্ত্ততঃ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনাবলী ও ভয় প্রদর্শন কোন কাজে আসে না’ (ইউনুস ১০/১০১)। সে যতই সৃষ্টির গভীরে ডুব দিবে, সে ততই সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব অনুভব করবে ও তাঁর প্রতি আনুগত্যশীল হবে। সাথে সাথে তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। সেই সঙ্গে এমনকি সমাজের একজন প্রতিবন্ধী দুর্বলতম ব্যক্তির মূল্যবোধ রক্ষায়ও সে আত্মনিয়োগ করবে।
৪. কুরআন অনুধাবন করা :
আল্লাহ বলেন,كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ مُبَارَكٌ لِيَدَّبَّرُوا آيَاتِهِ وَلِيَتَذَكَّرَ أُولُو الْأَلْبَابِ- ‘এটি এক বরকতমন্ডিত কিতাব, যা আমরা তোমার প্রতি নাযিল করেছি। যাতে লোকেরা  এর আয়াত সমূহ অনুধাবন করে এবং জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে’ (ছোয়াদ ৩৮/২৯)। হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রাঃ) বলেন, ‘আমি এক রাতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ)-এর সাথে ছালাত আদায় করেছিলাম। দেখলাম, যখন আল্লাহর গুণগানের কোন আয়াত আসে, তখন তিনি ‘সুবহানাল্লাহ’ বলেন। আবার যখন প্রার্থনার আয়াত আসে, তখন তিনি প্রার্থনা করেন। যখন আল্লাহ থেকে পানাহ চাওয়ার আয়াত আসে, তখন তিনি আল্লাহর আশ্রয় চান’… (মুসলিম হা/৭৭২)। ইবনু আববাস (রাঃ) বলেন, ‘যখন রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) سَبِّحِ اسْمَ رَبِّكَ الْأَعْلَى (সাবিবহিস্মা রবিবকাল আ‘লা) পড়তেন, তখন তিনি ‘সুবহা-না রবিবয়াল আ‘লা’ (মহাপবিত্র আমার প্রতিপালক, যিনি সর্বোচ্চ) বলতেন’।[12] সূরা ক্বিয়ামাহ-এর শেষ আয়াতأَلَيْسَ ذَلِكَ بِقَادِرٍ عَلَى أَنْ يُحْيِيَ الْمَوْتَى-এর জওয়াবে ‘সুবহা-নাকা ফা বালা’ (মহাপবিত্র আপনি! অতঃপর হাঁ, আপনিই মৃতকে জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন) বলতেন’।[13] এতে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) গভীর অনুধাবনের সাথে কুরআন তেলাওয়াত করতেন।
এভাবে মানুষ যত বেশী কুরআন অনুধাবন করবে, তত বেশী তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু যে ব্যক্তি অনুধাবন ছাড়াই কুরআন পাঠ করে, সে এর স্বাদ আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হয় এবং অফুরন্ত কল্যাণ থেকে মাহরূম হয়। আল্লাহ বলেন,إِنَّ فِي ذَلِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبٌ أَوْ أَلْقَى السَّمْعَ وَهُوَ شَهِيدٌ ‘নিশ্চয় এতে উপদেশ রয়েছে যার অনুধাবন করার মত অন্তর রয়েছে এবং যে কান পেতে মনোযোগ দিয়ে তা শ্রবণ করে’ (ক্বাফ ৫০/৩৭)। মর্ম উপলব্ধি করে কুরআন পাঠ করলে তার দেহ-মনে ভীতির সঞ্চার হবে। যেমন আল্লাহ বলেন, اللهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كِتَابًا مُتَشَابِهًا مَثَانِيَ تَقْشَعِرُّ مِنْهُ جُلُودُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُمْ ثُمَّ تَلِينُ جُلُودُهُمْ وَقُلُوبُهُمْ إِلَى ذِكْرِ اللهِ ذَلِكَ هُدَى اللهِ يَهْدِي بِهِ مَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُضْلِلِ اللهُ فَمَا لَهُ مِنْ هَادٍ- ‘আল্লাহ সর্বোত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব নাযিল করেছেন। যা পরস্পরে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পুনঃ পুনঃ পঠিত। এতে তাদের দেহচর্ম ভয়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে, যারা তাদের প্রতিপালককে ভয় করে। অতঃপর তাদের দেহ-মন আল্লাহর স্মরণে বিনীত হয়। এটা হ’ল আল্লাহর পথপ্রদর্শন। এর মাধ্যমে তিনি যাকে চান পথপ্রদর্শন করেন। আর আল্লাহ যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ দেখানোর কেউ নেই’ (যুমার ৩৯/২৩)। মুসলিম উম্মাহর জ্ঞানীগণ যাতে ইহূদী-নাছারা আলেমদের মত আল্লাহ থেকে উদাসীন ও শক্ত হৃদয়ের না হয়, সেদিকে সাবধান করে আল্লাহ বলেন, أَلَمْ يَأْنِ لِلَّذِينَ آمَنُوا أَنْ تَخْشَعَ قُلُوبُهُمْ لِذِكْرِ اللهِ وَمَا نَزَلَ مِنَ الْحَقِّ وَلاَ يَكُونُوا كَالَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلُ فَطَالَ عَلَيْهِمُ الْأَمَدُ فَقَسَتْ قُلُوبُهُمْ وَكَثِيرٌ مِنْهُمْ فَاسِقُونَ- ‘মুমিনদের জন্য কি এখনও সে সময় আসেনি যে, আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য (কুরআন) নাযিল হয়েছে, তার প্রতি তাদের হৃদয় সমূহ ভীত-সন্ত্রস্ত হবে? তারা যেন তাদের মত না হয়, যাদেরকে ইতিপূর্বে কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের উপর সেটি সুদীর্ঘ কাল অতিক্রান্ত হয়েছে। অতঃপর তাদের হৃদয় সমূহ কঠিন হয়ে গেছে। বস্ত্ততঃ তাদের বহু লোক ছিল পাপাচারী’ (হাদীদ ৫৭/১৬)
হাফেয ইবনুল ক্বাইয়িম (রহঃ) বলেন,فقراءة آيَة بتفكر وتفهم خير من قِرَاءَة ختمة بِغَيْر تدبر وتفهم وأنفع للقلب وأدعى الى حُصُول الايمان وذوق حلاوة الْقُرْآن ‘কুরআনের একটি আয়াত চিন্তা-গবেষণা ও বুঝে-শুনে পাঠ করা, বিনা অনুধাবনে ও বিনা বুঝে কুরআন খতম করার চাইতে উত্তম। যা হৃদয়ের জন্য অধিক উপকারী এবং ঈমান হাছিলে ও কুরআনের স্বাদ আস্বাদনে সর্বাধিক কাম্য’।[14]
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ تَعَلَّمَ عِلْمًا مِمَّا يُبْتَغَى بِهِ وَجْهُ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ لاَ يَتَعَلَّمُهُ إِلاَّ لِيُصِيبَ بِهِ عَرَضًا مِنَ الدُّنْيَا لَمْ يَجِدْ عَرْفَ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ- ‘যে ব্যক্তি ইলম শিক্ষা করল যার মাধ্যমে আল্লাহর চেহারা অন্বেষণ করা হয়, অথচ সে তা শিক্ষা করে দুনিয়াবী সম্পদ অর্জন করার জন্য, সে ক্বিয়ামতের দিন জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না’।[15] রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) দো‘আ করতেন,اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجَابُ لَهَا- ‘হে আল্লাহ! আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঐ ইলম থেকে যা কোন ফায়েদা দেয় না। ঐ অন্তর থেকে যা তোমার ভয়ে ভীত হয় না। ঐ আত্মা থেকে যা তৃপ্ত হয় না এবং ঐ দো‘আ থেকে যা কবুল হয় না’।[16]
হযরত কা‘ব বিন মালেক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,مَنْ طَلَبَ الْعِلْمَ لِيُجَارِىَ بِهِ الْعُلَمَاءَ أَوْ لِيُمَارِىَ بِهِ السُّفَهَاءَ أَوْ يَصْرِفَ بِهِ وُجُوهَ النَّاسِ إِلَيْهِ أَدْخَلَهُ اللهُ النَّارَ ‘যে ব্যক্তি ইলম শিখে এজন্য যে, তার দ্বারা সে আলেমদের সঙ্গে মুকাবিলা করবে অথবা বোকাদের সঙ্গে ঝগড়া করবে অথবা লোকদের চেহারা তার দিকে ফিরিয়ে নিবে, আল্লাহ তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন’।[17]
ওমর ফারূক (রাঃ)-এর নিকটে জনৈক ব্যক্তি লোকদের প্রতি ওয়ায করার অনুমতি চাইলে তিনি তাকে বলেন,أَخْشَى عَلَيْكَ أَنْ تَقُصَّ فَتَرْتَفِعَ عَلَيْهِمْ فِى نَفْسِك ثُمَّ تَقُصَّ فَتَرْتَفِعَ حَتَّى يُخَيَّلَ إِلَيْكَ أَنَّكَ فَوْقَهُمْ بِمَنْزِلَةِ الثُّرَيَّا فَيَضَعَكَ اللَّهُ تَحْتَ أَقْدَامِهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِقَدْرِ ذَلِكَ. ‘আমার ভয় হয় ওয়ায করার ফলে তোমার মধ্যে ধ্রুবতারার ন্যায় উচ্চ মর্যাদা পাওয়ার অহংকার সৃষ্টি হবে। আর তাতে আল্লাহ তোমাকে ক্বিয়ামতের দিন ঐসব লোকদের পায়ের তলায় রাখবেন’।[18]
অতএব বান্দা যখন আল্লাহর আয়াত সমূহ গবেষণা করবে এবং এর মধ্যে জান্নাতের পুরস্কার ও জাহান্নামের হুমকি সমূহ জানবে এবং সে অনুযায়ী কর্ম সম্পাদনের দিকে এগিয়ে যাবে, তখন সে জাহান্নামের ভয়ে ভীত হবে এবং জান্নাত লাভের জন্য তার ঈমান বৃদ্ধি পাবে। 



[1]. মুসলিম হা/২৭৩৩; মিশকাত হা/২২২৮ ‘দো‘আ সমূহ’ অধ্যায়।
[2]. বুখারী হা/৬৪১০, ৭৩৯২; মুসলিম হা/২৬৭৭; মিশকাত হা/২২৮৭।
[3]. আব্দুর রহমান বিন নাছের আস-সা‘দী, আত-তাওযীহু ওয়াল বায়ান লে শাজারাতিল ঈমান ৭২ পৃ.।
[4]. আব্দুর রহমান দামেশক্বিইয়াহ, আন-নকশবন্দিইয়াহ (রিয়াদ, দার ত্বাইয়েবাহ, ৩য় সংস্করণ ১৪০৯ হি./১৯৮৮ খৃ.) ৭৫, ৭৭ পৃ.।
[5]. বুখারী হা/৬১৪; মিশকাত হা/৬৫৯; রাবী জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ)।
[6]. মুসলিম হা/২০৪; মিশকাত হা/৫৩৭৩।
[7]. ইবনু মাজাহ হা/১৭৩; ছহীহুল জামে‘ হা/৩৩৪৭।
[8]. ইবনু রজব হাম্বলী, ফাযলু ইলমিস সালাফ ‘আলাল খালাফ ৭ পৃ.।
[9]. মুসলিম হা/৮; মিশকাত হা/২।
[10]. মুসলিম হা/২৬৯৯; মিশকাত হা/২০৪।
[11]. ছহীহ ইবনু হিববান হা/৬২০; সনদ ছহীহ -আরনাঊত্ব।
[12]. আহমাদ হা/২০৬৬; আবুদাঊদ হা/৮৮৩; মিশকাত হা/৮৫৯ ‘ছালাতে ক্বিরাআত’ অনুচ্ছেদ-১২।
[13]. বায়হাক্বী হা/৩৫০৭; আবুদাঊদ হা/৮৮৪ ‘ছালাতে দো‘আ’ অনুচেছদ-১৫৪, হাদীছ ছহীহ।
[14]. ইবনুল ক্বাইয়িম, মিফতাহু দারিস সা‘আদাহ (বৈরূত : দারুল কুতুবিল ইলমিইয়াহ, তাবি) ১/১৮৭।
[15]. আবুদাঊদ হা/৩৬৬৪; ইবনু মাজাহ হা/২৫২; মিশকাত হা/২২৭।
[16]. মুসলিম হা/২৭২২; মিশকাত হা/২৪৬০।
[17]. তিরমিযী হা/২৬৫৪, সনদ হাসান; মিশকাত হা/২২৫।
[18]. আহমাদ হা/১১১, সনদ হাসান।


উৎস:  ইসলামিক অনলাইন মিডিয়া