Articles by "শিক্ষাঙ্গন"
Showing posts with label শিক্ষাঙ্গন. Show all posts
ভারতবর্ষে উচ্চশিক্ষার শুরু ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর। ১৮৫৭ সালে ভারতের বড় লাট লর্ড ক্যানিং 'দ্য অ্যাক্ট অফ ইনকরপোরেশন' পাশ করে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হল কোলকাতা, বোম্বে এবং মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়। এর আগে থেকেই ভারতবর্ষে উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা ছিল কিন্তু এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় ইউরোপিয় মডেলে।
অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মত কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের মান ছিল উঁচু। আর এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ছিলেন মূলত পশ্চিম বঙ্গের উঁচুতলার হিন্দু সন্তানরা।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের আগে অবিভক্ত বাংলায় ১৯টি কলেজ ছিল। তার মধ্যে পূর্ব বাংলায় নয়টি। তবে সেটাই পর্যাপ্ত ছিল বলে মনে করেননি তখনকার পূর্ব বাংলার মানুষ।

কেন পূর্ববঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজন ছিল:

১৯০৫ সালে বাংলা প্রেসিডেন্সি ভাগ করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে নতুন এক প্রদেশ করা হয়। যার প্রচলিত নাম বঙ্গভঙ্গ।
পূর্ববঙ্গে পিছিয়ে পরা জনগোষ্ঠী বিশেষ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে আসা ছিল এই উদ্যোগের একটি অংশ।
বঙ্গভঙ্গের এই সময়টা ছিল খুব অল্প সময়ের জন্য, মাত্র ছয় বছর। কারণ এর মধ্যেই পশ্চিম বঙ্গের হিন্দু নেতারা প্রবল আন্দোলন করেন এই বঙ্গভঙ্গের।

এদিকে মুসলমান নেতারা নতুন প্রদেশ হওয়াতে শিক্ষাসহ নানা সুবিধা পাবেন এই আশায় উজ্জীবিত হন।
কিন্তু গোটা ভারতবর্ষে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তাদের বিরোধিতার মুখে ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ করা হয়।
ফলে মুসলমানদের ক্ষোভ আরো পুঞ্জিভূত হতে থাকে। তারা মনে করে অর্থনৈতিক বৈষম্যের সাথে সাথে শিক্ষা ক্ষেত্রেও তারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
লেখক এবং গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা' বই এ লিখেছেন "কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর বাঙালী মুসলমানদের ক্ষোভ ছিল ১৯০৫- এ পূর্ব বাংলা এবং আসাম প্রদেশ গঠনের অনেক আগে থেকেই। ... ক্ষোভের কারণ শুধু হিন্দু প্রাধান্য নয়, শিক্ষাক্রমে হিন্দুধর্ম প্রাধান্য পাওয়ায় মুসলমানদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়"।
যারা বিরোধিতা করেছিলে:
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে বিরোধী হিসেবে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর নাম সৈয়দ আবুল মকসুদের 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা' বইতে উঠে এসেছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের কিছু লোকজনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন বলে উল্লেখ করা হয়।
ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ১৯১২ সালে তাঁর ঢাকা সফর শেষে কলকাতা প্রত্যাবর্তন করলে ১৯১২ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ড. রাসবিহারী ঘোষের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল তার সাথে সাক্ষাৎ এবং ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতামূলক একটি স্মারকলিপি পেশ করেন।
এসংক্রান্ত বিভিন্ন বইতে উঠে এসেছে, লর্ড হার্ডিঞ্জ স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, কী মূল্যে অর্থাৎ কিসের বিনিময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা থেকে বিরত থাকবেন?
শেষ পর্যন্ত স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চারটি নতুন অধ্যাপক পদ সৃষ্টির বিনিময়ে তার বিরোধিতার অবসান করেছিলেন। পরবর্তীতে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষক নিয়োগে সহযোগিতা করেন।

তার সঙ্গে ছিলেন স্যার নীলরতন সরকার।

কেন এই বিরোধিতা?:

কথা সাহিত্যিক এবং প্রাবন্ধিক কুলদা রায় তাঁর 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা ও রবীন্দ্রনাথ' নামক প্রবন্ধে লিখেছেন মূলত-বিরোধিতা করেছিলেন তিন ধরনের লোকজন-
এক. পশ্চিমবঙ্গের কিছু মুসলমান-তারা মনে করেছিলেন, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হলে পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানদের কোনো লাভ নেই। পূর্ববঙ্গের মুসলমানদেরই লাভ হবে। তাদের জন্য ঢাকায় নয় পশ্চিমবঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় হওয়াটাই লাভজনক।
দুই. পূর্ব বাংলার কিছু মুসলমান-তারা মনে করেছিলেন, পূর্ব বঙ্গের মুসলমানদের মধ্যে ১০০০০ জনের মধ্যে ১ জন মাত্র স্কুল পর্যায়ে পাশ করতে পারে। কলেজ পর্যায়ে তাদের ছাত্র সংখ্যা খুবই কম। বিশ্ববিদ্যালয় হলে সেখানে মুসলমান ছাত্রদের সংখ্যা খুবই কম হবে।
পূর্ববঙ্গে প্রাইমারী এবং হাইস্কুল হলে সেখানে পড়াশুনা করে মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার হার বাড়বে। আগে সেটা দরকার। এবং যদি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে মুসলমানদের জন্য যে সরকারী বাজেট বরাদ্দ আছে তা বিশ্ববিদ্যালয়েই ব্যয় হয়ে যাবে। নতুন করে প্রাইমারী বা হাইস্কুল হবে না। যেগুলো আছে সেগুলোও অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। সেজন্য তারা বিশ্ববিদ্যালয় চান নি।
তিন. পশ্চিমবঙ্গের কিছু হিন্দু মনে করেছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেট বরাদ্দ কমে যাবে। সুতরাং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় চলবে কীভাবে? এই ভয়েই তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি বিরোধিতা করেছিলেন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভূমিকা কী ছিল সেটা নিয়ে বিস্তর লেখা-লেখি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে।
যারা বলেছেন তিনি এর বিরোধিতা করেছিলেন তারা স্বপক্ষে দালিলিক কোন তথ্য প্রমাণ দেন নি।
সেই সময়কার সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা এবং রবীন্দ্রনাথের সেই সময় যাদের সাথে উঠা-বসা ছিল তাদের কয়েকজন ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে।
তাই অনেকেই সহজ সমীকরণ মিলিয়ে লিখেছেন তিনিও এর বিপক্ষেই ছিলেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ তাঁর 'ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা' বই এ লিখেছেন "শ্রেণীস্বার্থে রবীন্দ্রনাথও ছিলেন কার্জনের (লর্ড কার্জন) ওপর অতি ক্ষুব্ধ। কার্জনের উচ্চশিক্ষাসংক্রান্ত মন্তব্যের তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় কলকাতার হিন্দু সমাজে। তাতে রবীন্দ্রনাথও অংশগ্রহণ করেন। তিনি যে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করেন,তাতে কিছু ছিল যুক্তি, বেশির ভাগই ছিল আবেগ এবং কিছু ছিল ক্ষোভ"।
আবার যারা রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতা করেননি বলেছেন তাঁরা এর স্বপক্ষে বেশ কিছু ঘটনা এবং এবং দিন তারিখের কথা উল্লেখ করেছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ বলেছেন " কেউ কেউ কোনো প্রমাণ উপস্থিত না করেই লিখিতভাবে জানাচ্ছেন যে, ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ মার্চ কলকাতায় গড়ের মাঠে রবীন্দ্রনাথের সভাপতিত্বে এক বিরাট জনসভা হয়। ও রকম একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল বটে, কিন্তু তাতে রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি ছিল অসম্ভব, কেননা সেদিন তিনি কলকাতাতেই ছিলেন না। ১৯১২ সালের ১৯ মার্চ সিটি অব প্যারিস জাহাজযোগে রবীন্দ্রনাথের বিলাতযাত্রার কথা ছিল। তাঁর সফরসঙ্গী ডাক্তার দ্বিজেন্দ্রনাথ মিত্র জাহাজে উঠে পড়েছিলেন, কবির মালপত্রও তাতে তোলা হয়ে গিয়েছিল; কিন্তু আকস্মিকভাবে ওইদিন সকালে রবীন্দ্রনাথ অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে মাদ্রাজ থেকে তাঁর মালপত্র ফিরিয়ে আনা হয়। কলকাতায় কয়েক দিন বিশ্রাম করে ২৪ মার্চ রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহে চলে আসেন এবং ২৮ মার্চ থেকে ১২ এপ্রিলের মধ্যে সেখানে বসে ১৮টি গান ও কবিতা রচনা করেন"।
 আবার সেই সময়কার সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং গবেষক তৌহিদুল হক বলছিলেন " ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যে তিন শ্রেণীর মানুষ বিরোধিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে আমরা রবীন্দ্রনাথকে তৃতীয় কাতারে রাখতে চাই। কারণ তারা ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের উচ্চবর্ণের কিছু হিন্দু সমাজ। তাঁদের সাথে বিশেষ করে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় আর রাজনীতিক সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জীর সাথে রবীন্দ্রনাথের একাধিকবার বৈঠক,আলোচনা হয়েছে শিলাইদহ যাওয়ার আগেও।এ থেকে আমরা অনুধাবন করতে চাই সেখানে পূর্ববঙ্গের সার্বিক উন্নতি নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। তবে এরও কোন স্পষ্ট তথ্য প্রমাণ নেই"।

যারা পক্ষে কাজ করেছিলেন:

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিরোধিতা যে হয়েছিল নানা পক্ষ থেকে সেটা ইতিহাস ঘাটলে তথ্য পাওয়া যায়।
কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আবশ্যকতা রয়েছে সেটা বোঝাতে এবং প্রতিষ্ঠার ব্যাপার অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন যাঁরা তাদের কথা না বললেই নয়।
এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঢাকার নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। কিন্তু, হঠাৎ করে ১৯১৫ সালে নবাব সলিমুল্লাহের মৃত্যু ঘটলে নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী শক্ত হাতে এই উদ্যোগের হাল ধরেন।
অন্যান্যদের মধ্যে আবুল কাশেম ফজলুল হক উল্লেখযোগ্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় পূর্ব বাংলার হিন্দুরাও এগিয়ে এসেছিলেন।
এদের মধ্যে ঢাকার বালিয়াটির জমিদার অন্যতম। জগন্নাথ হলের নামকরণ হয় তাঁর পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর নামে।
আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক স্বপ্ন পূরণের দিন ছিল ৮৮ বছর আগের এক পহেলা জুলাই। সেদিন ১৯২১ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় এদেশের শ্রেষ্ঠতম বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের এই সর্বপ্রথম বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠা নিয়ে আমাদের সেকালের নেতৃবৃন্দের যে কত ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল তা আজকের দিনে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। প্রশাসনিক প্রয়োজনে বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীকে বিভক্ত করে ঢাকায় রাজধানীসহ ‘পূর্ববঙ্গ ও আসাম' নামের একটি নতুন প্রদেশ গঠন করা হয়। এই পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দীর্ঘদিন অবহেলিত মুসলিম অধ্যুষিত পূর্ববঙ্গের উন্নতির কিছুটা সুযোগ হয়।
পাঁচ-ছয় বছরের মধ্যে এই অঞ্চলের অবহেলিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষা-দীক্ষা ও অন্যান্যক্ষেত্রে বেশ কিছুটা উন্নতির ভাব পরিলক্ষিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে কায়েমী স্বার্থভোগী কলিকাতাপ্রবাসী জমিদাররা ১৯০৫ সাল থেকেই এই নতুন প্রদেশ সৃষ্টির বিরুদ্ধে বিরাট আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে মাত্র ছয় বছরের মাথায় ইংরেজ সরকার এ নতুন প্রদেশ বাতিল করে দিতে বাধ্য হয়। সরকারের এ সর্বশেষ সিদ্ধান্ত পূর্ববঙ্গের জনগণ বিশেষ করে, মুসলমানদের মধ্যে বিপুল ক্ষোভ ও হতাশা দানা বেঁধে ওঠে। তাদের ক্ষোভ প্রশমনের লক্ষ্যে পূর্ববঙ্গের অন্যতম দাবি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয় সরকার। এর বিরুদ্ধেও কলিকাতা প্রবাসী কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীরা এই উদ্ভট যুক্তিতে প্রতিবাদ জানায় যে, পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান চাষাভুষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন নেই। তারা ইংরেজ সরকারের কাছে সভা-সমাবেশ, মেমোরেন্ডাম প্রভৃতির মাধ্যমে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ জানাতে থাকে। ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে তিনটি যুক্তি তখন বড়ভাবে দেখানো হয়। তিনটি যুক্তিই খুব অদ্ভুত। প্রথমত: ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে নাকি শিক্ষার মান ক্ষুণ্ণ হবে। দ্বিতীয়ত: ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষা-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বিভাজন সৃষ্টি হবে। তৃতীয়ত: ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হবে উলুবনে মুক্তা ছড়ানোর শামিল। কারণ পূর্ববঙ্গের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান চাষাভুষা, তাই তাদের উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কোনো প্রয়োজন নেই। এই শেষোক্ত যুক্তির মাধ্যমেই বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধীদের আসল মনোভাব, আসল মতলব বেরিয়ে এলো। অর্থাৎ মুসলমানরা পিছনে পড়ে আছে, তারা পিছনেই পড়ে থাক। যারা এগিয়ে আছে, তাদেরই আরো এগিয়ে নেয়া হোক। এই যে দেশের একটি জনগোষ্ঠীকে পেছনে ঠেলে দিয়ে আরেকটি জনগোষ্ঠীকে আরো এগিয়ে নেয়ার মনোভাব, এই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোভাবই কাজ করেছে বৃটিশ শাসনামলে অধিকাংশ হিন্দু কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিকের মধ্যে। বঙ্গভঙ্গকালে অবিভক্ত বঙ্গদেশে মোট ৪৫টি কলেজ ছিল। তার ৩০টিই ছিল পশ্চিমবঙ্গে। পূর্ববঙ্গ ও আসামে ছিল মাত্র ১৫টি। আসামে ছিল দু'টি, একটি গৌহাটিতে, অপরটি সিলেটে। মুসলিম অধ্যুষিত সমগ্র পূর্ববঙ্গে ছিল মাত্র ১৩টি কলেজ, যদিও পূর্ববঙ্গের জনসংখ্যা ছিল পশ্চিমবঙ্গের চেয়ে অনেক বেশি। শুধু কলিকাতায়ই ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়, ১৩টি কলেজ এবং মেডিকেল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজসহ ৭টি পেশাজীবী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।
অথচ ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবেই এমন হৈ চৈ শুরু করে দেয়া হয় যেন এর ফলে দেশের মহা সর্বনাশ হয়ে যাচ্ছে। ১৯২২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কলিকাতায় বিডন স্কোয়ারে সুরেন্দ্রনাথ সমাজপতির সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে যে প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয় তাতে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে বাংলা সাহিত্য বিভক্ত হয়ে পড়বে, কেননা পূর্ববঙ্গের অর্ধশিক্ষিত ও মুসলিম লেখকরা আরবি, ফার্সি, উর্দু শব্দযোগে যে সাহিত্য রচনা করবেন তা পশ্চিমবঙ্গের ভাষা থেকে স্বতন্ত্র হবে। ফলে বাংলাভাষা ও সাহিত্য দ্বিধাবিভক্ত হবে। সাহিত্য যদি বিভক্ত হয় তাহলে বাঙ্গালী জাতি আবারো বিভক্ত হবে এবং তা ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে আরো মারাত্মক হয়ে উঠবে। সবচাইতে মজার ব্যাপার হলো, ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেন খোদ ঢাকার হিন্দুপ্রধান উকিলসমাজও। ৫ ও ১০ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে ঢাকা উকিল সমিতি দু'টি প্রতিবাদ সভার অনুষ্ঠান করে ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে এই যুক্তিতে বিরোধিতা করে যে, এতে করে শিক্ষার মান অবনত হবে। দু'টি সভায়ই সভাপতিত্ব করেন উকিল ত্রৈলোক্য নাথ বসু। শিক্ষিত হিন্দুদের সৃষ্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী এই আন্দোলনের ফলে ইংরেজ সরকার খুব বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যায়। বঙ্গভঙ্গ রদ করায় মুসলমানরা এমনিতেই ভয়ংকর ক্ষুব্ধ হয়ে আছে, এখন যদি ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওয়াদা থেকেও সরকারকে সরে আসতে হয়, তাহলে তা মুসলমানদের আরো বিক্ষুব্ধ করে তুলবে। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধী হিন্দু নেতারাই সমস্যার সমাধান হিসেবে নতুনভাবে আন্দোলনের দাবি উত্থাপন করেন। তারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত না হওয়াই ভালো। অগত্যা যদি ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়ই তা হলে তা শুধু শিক্ষাদান কার্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির বাইরে তার কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না এবং অন্য কোনো কলেজের এফিলিয়েটিং ক্ষমতাও তার থাকবে না। অর্থাৎ অবিভক্ত বিশাল বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীর সীমানার মধ্যে সমস্ত কলেজ ও মাধ্যমিক স্কুলকে পূর্ববৎ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীনেই রেখে দিয়ে জন্মলগ্ন থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি পঙ্গু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হলো। সরকার হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। সরকার মুসলমানদের ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওয়াদা দিয়েছে, সে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা ও এখতিয়ার নিয়ে তো আর কোনো কথা বলেনি। মুসলিম নেতারাও অগত্যা যা পেলেন, তা নিয়েই খুশি থাকতে চেষ্টা করলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মূল উদ্যোক্তা নবাব সলিমুল্লাহ বঙ্গভঙ্গ রদের আঘাতে সেই যে শোকাহত হন, সেই শোক-দুঃখে তিনি রাজনীতি থেকেই ১৯১২ সালে অবসর নিলেন। এরপর তিনি আরো তিন বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় তিনি দেখে যেতে পারেননি, কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে কোনো অসুবিধা যাতে না হয়, সেজন্য তিনি তার জমিদারি থেকে একশ' বিঘারও অধিক জমি দান করে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য। এরপর ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বৃটিশ শাসিত ভারত সরকারের সুপারিশ বৃটিশ সরকারের ভারত-সচিব কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ১৯১২ সালেই ব্যরিস্টার রবার্ট নাথনকে সভাপতি এবং ডিএস ফ্রেজারকে সদস্য-সচিব করে ১৩ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিস্তারিত বিষয়াদি নির্ধারণের লক্ষ্যে। এই ১৩ সদস্য বিশিষ্ট নাথন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিরোধ আন্দোলনের অন্যতম হোতা রাসবিহারী ঘোষসহ ৭ জন অমুসলিম সদস্য। এই কমিটিতে নওয়াব আলী চৌধুরী, মোহাম্মদ আলী, নওয়াব সিরাজুল ইসলাম ও আবু নসব ওয়াহিদ প্রমুখ ৪ জন মুসলিম সদস্য থাকলেও তাদের করার কিছুই ছিল না। কারণ বৃটিশশাসিত ভারত সরকারের পরিষ্কার দিকনির্দেশনা ছিল: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে একটি শিক্ষাদানমূলক আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং শুধু ঢাকা নগরীর কলেজগুলোর সমন্বয়ে এফিলিয়েটিংয়ের ক্ষমতারহিত একক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানরূপে গড়ে উঠবে এ বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১৩ সালে নাথন কমিটির রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। ১৯১৪ সালে প্র্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার অজুহাতে সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকার্য স্থগিত করার সুযোগ পেয়ে যান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল স্বপ্নদ্রষ্টা নবাব সলিমুল্লাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে পারেননি। ১৯১৫ সালে তিনি অল্প বয়সে ভগ্নহৃদয়ে ইন্তিকাল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর দুই কৃতী সহযোগী ধানবাড়ির জমিদার সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী এবং উদীয়মান জননেতা একে ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটানা চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। অতপর প্রধানত সৈয়দ নওয়াব আলী চৌধুরী অব্যাহত চেষ্টায় ১৯১৯ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপক সভায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিল উত্থাপিত হয় এবং তা ১৯২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আইন হিসেবে অনুমোদিত হয়। ১৯২০ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভাইস চ্যান্সেলর ফিলিপ জেহার্টস তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অতপর ১৯২১ সালের ১ জুলাই থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যার তুলনায় হিন্দুদের সংখ্যা বহুদিন পর্যন্ত বেশি ছিল। শিক্ষকদের অবস্থাও তথৈবচ। প্রথমদিকের বেশ কয়েকজন ভাইস চ্যান্সেলরই ছিলেন ইংরেজ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম এ দেশি ভাইস চ্যান্সেলরও ছিলেন হিন্দু। স্যার এএফ রহমানের আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো মুসলমান ভাইস চ্যান্সেলরপদে নিয়োগ পাননি। প্রতিষ্ঠাকালে যে তিনটি আবাসিক হল নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করে সেগুলো ছিল সকল সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য উন্মুক্ত ঢাকা হল, হিন্দুদের জন্য জগন্নাথ হল এবং মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের জন্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হল। এই তিন হলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৩৮৬, ৩১৩ ও ১৭৮ জন। মাত্র ৮৭৭ জন ছাত্রছাত্রী নিয়ে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা শুরু করেছিল তা এককালে শিক্ষা-দীক্ষায় এতটাই উন্নত ছিল যে, একে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলে অভিহত করা হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যারা বিরোধী ছিল তাদের চক্রান্তেই ১৯২১ সালের ১ জুলাই এফিলিয়েটিংয়ের ক্ষমতাবিহীন একটি ঠুঁটো জগন্নাথ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় তার এ রুগ্নদশা থেকে মুক্তি পায় সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর। তখন তদানীন্তন পূর্ববঙ্গ বা পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত কলেজ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধিপত্য থেকে মুক্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীনে আসে। সাতচল্লিশের আগে এদেশের স্কুল ও কলেজই কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাভুক্ত ছিল। সাতচল্লিশের পার্টিশনের পর সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের সকল কলেজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতাধীন আসে এবং সমস্ত স্কুল ঢাকা বোর্ডের এখতিয়ারভুক্ত হয়। এই হিসাবে বলা যায়, সাতচল্লিশের পার্টিশনের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার জন্মকালীন পঙ্গুদশা থেকে মুক্তি লাভ করে।